মোদির রাজনীতিতে প্রজন্মের দূরত্ব, বাবা-মায়ের আদর্শ ছাড়ছেন ভারতের তরুণরা

ভারতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখন আর শুধু রাজপথ কিংবা নির্বাচনী প্রচারে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে পরিবারেও। বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সমর্থক পরিবারের অনেক তরুণ-তরুণী এখন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে ঝুঁকছেন। কেউ সরাসরি মোদি সরকারের বিরোধিতায় আন্দোলনে নামছেন, আবার কেউ পরিবার ও নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের দ্বন্দ্বে বাড়ি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্দোলনকে ঘিরে ভারতের তরুণদের মধ্যে এই পরিবর্তন আরও দৃশ্যমান হয়েছে। শিক্ষা সংস্কার, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, সরকারি নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিবাদে অংশ নেওয়া অনেক তরুণের পরিবারই তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছে না। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য কোথাও কোথাও পারিবারিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি করছে।
বাবার রাজনৈতিক আদর্শ থেকে ভিন্ন পথে কুনাল
১৯ বছর বয়সী কুনাল চৌধুরীর গল্পটি এ পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। পাঞ্জাবের লুধিয়ানা থেকে দিল্লিতে তরুণদের আন্দোলনে যোগ দিতে যান তিনি। বিজেপি ও আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা কুনাল একসময় নিজেও আরএসএসের কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।
তবে সময়ের সঙ্গে তার রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন আসে। কুনালের দাবি, নিজের চারপাশের সামাজিক বাস্তবতা এবং আন্দোলনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ তাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।
দিল্লির আন্দোলনে যোগ দিতে গিয়ে তিনি বাড়ি ছেড়েছেন। তার ভাষায়, চারপাশে যা ঘটছে তা দেখে নীরব থাকা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
আন্দোলনের সময় তার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি নিজের পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করে সরকারের সমালোচনা করেন। ভিডিওটি দেখে তার বাবা তাকে বিজেপি ও আরএসএসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা না বলার পরামর্শ দেন। কিন্তু কুনালের বক্তব্য, তিনি শুধু নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলেছেন।
বর্তমানে দিল্লির একটি গুরুদ্বারে অবস্থান করছেন তিনি। ভবিষ্যতে কাজ করে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি দূরশিক্ষণের মাধ্যমে আইন পড়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার। মা নীরবে তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও আপাতত বাড়ি ফেরার ইচ্ছা নেই কুনালের।
বাবার আপত্তি উপেক্ষা করে আন্দোলনে প্রিয়া
২৪ বছর বয়সী প্রিয়া সিংয়ের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তার বাবা বিজেপির সমর্থক। দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বাবার কাছ থেকে শারীরিকভাবে মারধরের হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
আন্দোলনে যাওয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখতেন প্রিয়া, যাতে ছবি বা ভিডিও দেখে তাকে শনাক্ত করা না যায়। তবে বাবাকে তিনি জানিয়েছিলেন, সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেই তিনি সেখানে যাচ্ছেন।
দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার এই শিক্ষার্থী জানান, পরিবারের কাউকে না জানিয়েই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও সেখানকার পরিবেশ নিয়েও পরিবারের সঙ্গে তার মতপার্থক্য রয়েছে।
পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের অনেক বিষয়ই এখন তিনি তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন না।
একসময় মোদির সমর্থক, এখন বাম রাজনীতিতে অঞ্জলি
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ২৫ বছর বয়সী অঞ্জলির রাজনৈতিক পরিবর্তনও প্রজন্মগত দূরত্বের বিষয়টি সামনে আনে। বিহারে বেড়ে ওঠা অঞ্জলি এখন বামপন্থি ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সঙ্গে যুক্ত।
তার বাবা-মা বিজেপির সমর্থক এবং আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত। অঞ্জলি জানান, একসময় তিনিও নরেন্দ্র মোদির সমর্থক ছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালের দিকে তার রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন আসে। পরে বামপন্থি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি।
পরিবারের সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে সরাসরি আলোচনা এড়িয়ে চললেও মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের সমর্থন রয়েছে। আন্দোলনে আহত হওয়ার পর মা ফোন করে তার খোঁজ নেন। এমনকি আন্দোলনের পর পরিবর্তনের কিছু ঘটনায় মেয়ের ভূমিকা নিয়ে গর্বও প্রকাশ করেন তিনি।
মেয়ের অনশনে পাশে দাঁড়ালেন বিজেপি সমর্থক মা
২৯ বছর বয়সী নেহা বোরার ঘটনাতেও একই ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা যায়। তিনি এআইএসএর জাতীয় সভাপতি এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী। আন্দোলনের সময় তিনি দীর্ঘ সময় অনশন করেন।
তার বাবা একজন সেনা কর্মকর্তা এবং মা গৃহিণী। দুজনেই বিজেপির সমর্থক হলেও মেয়ের রাজনৈতিক অবস্থান তাদের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তবে মেয়ের অনশনের খবর পেয়ে তার মা দিল্লির যন্তর মন্তরে ছুটে আসেন। আন্দোলনের একটি পর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর মেয়েকে অভিনন্দনও জানান তিনি।
কেন বদলাচ্ছে তরুণদের রাজনৈতিক অবস্থান?
ভারতের তরুণদের রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তনের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রজন্মগত ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
আরএসএসের মুখপত্র ‘অর্গানাইজার’-এর সম্পাদক প্রফুল্ল কেতকারের মতে, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের রাজনৈতিক চিন্তাকে প্রভাবিত করছে। মানুষ নিজের মতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য ও মতামতের মধ্যেই বেশি সময় কাটাচ্ছে।
অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক অনুভব সেনগুপ্তের মতে, বয়স্ক প্রজন্ম সাধারণত রাজনৈতিক বিষয়ে বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করে। বিপরীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অনেক সময় আদর্শ, মূল্যবোধ ও ন্যায়বোধকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। ফলে একই পরিবারের দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
রাজনীতির প্রভাব পড়ছে পরিবারে
ভারতের সাম্প্রতিক তরুণদের আন্দোলন তাই শুধু সরকারের নীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বিষয় নয়। এর প্রভাব পৌঁছে গেছে পরিবারগুলোর ভেতরেও।
বিজেপি-আরএসএস সমর্থক পরিবারে বেড়ে ওঠা কিছু তরুণ এখন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ গ্রহণ করছেন। কেউ বামপন্থি রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন, কেউ সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। এতে তৈরি হচ্ছে বাবা-মায়ের সঙ্গে মতবিরোধ, দূরত্ব এমনকি সাময়িক বিচ্ছিন্নতাও।
তবে একই সঙ্গে কিছু পরিবারে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও সন্তানের প্রতি ব্যক্তিগত সমর্থন বজায় থাকছে। ফলে ভারতের রাজনীতিতে প্রজন্মগত এই পরিবর্তন শুধু দলীয় সমীকরণ নয়, পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও কতটা বদলে দেয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।