বাংলাদেশি পর্যটক বাড়ায় ফের জমজমাট কলকাতার নিউ মার্কেট

দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা আবার চালু হওয়া এবং চিকিৎসা ভিসার অনুমোদন বাড়ায় কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে আগের প্রাণচাঞ্চল্য। পেট্রাপোলসহ বিভিন্ন সীমান্তপথ ও আকাশপথে বাংলাদেশি ভ্রমণকারীর সংখ্যা বাড়ায় হোটেল, পরিবহন, মানি এক্সচেঞ্জ ও পর্যটননির্ভর বিভিন্ন ব্যবসায় গতি ফিরছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ধীরে ধীরে কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় আগের ব্যস্ততার চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশি পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘদিন মন্দার মধ্যে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করছে।
দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা আবার চালু হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য ভারত যাওয়ার ক্ষেত্রে মেডিকেল ভিসার অনুমোদনও বেড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২০০ বাংলাদেশি পর্যটক ভারতে প্রবেশ করতেন। বর্তমানে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ হয়েছে। অন্যান্য স্থলবন্দর ও আকাশপথ মিলিয়ে প্রতিদিন ভারতে প্রবেশকারী বাংলাদেশির সংখ্যা ৪ হাজারের কিছু বেশি। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ চিকিৎসা ভিসায় এবং ২০ শতাংশ পর্যটন ভিসায় ভারতে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশি পর্যটকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য কলকাতার নিউ মার্কেট। দুই বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার ও জীবনযাত্রার মিলের কারণে বাংলাদেশিদের কাছে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়।
বাংলাদেশি পর্যটকদের কেন্দ্র করে নিউ মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, গেস্টহাউস, মানি এক্সচেঞ্জ, ট্রাভেল এজেন্সি, পোশাকের দোকান, প্রসাধনীর ব্যবসা, খাবারের দোকান ও বিভিন্ন বিপণিকেন্দ্র। পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ায় এসব ব্যবসায়ও ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
মারকুইস স্ট্রিটের একটি হাসপাতালের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জাফর খান বলেন, আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তাঁর আশা, ধীরে ধীরে নিউ মার্কেট এলাকায় আগের ব্যস্ততা ফিরে আসবে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষের বড় অংশ চিকিৎসা ভিসায় এবং তুলনামূলক কমসংখ্যক পর্যটন ভিসায় আসছেন বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশি পর্যটকদের আগমনের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। সোহাগ পরিবহনের কর্মকর্তা সুরজিৎ ঘোষ জানান, আগের তুলনায় যাত্রী বেড়েছে। তবে প্রত্যাশার তুলনায় এখনো সংখ্যা কম। বর্তমানে প্রতিদিন একটি করে বাস সীমান্তের দিকে যাচ্ছে। যাত্রী বাড়লে বাসের সংখ্যাও বাড়ানো হবে।
গ্রিনলাইন পরিবহনের কর্মকর্তা শ্যামল ঘোষ বলেন, তাঁরা পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী। আগের তুলনায় যাত্রী প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে এবং প্রতিদিনই সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে তিনটি বাস চলাচল করছে; ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বাস চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নিউ মার্কেটের মারকুইস স্ট্রিট, টটি লেন, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড, কিড স্ট্রিট, রয়েড স্ট্রিট, কলিন লেন ও লিন্ডসে স্ট্রিট এলাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য অংশের আয় বাংলাদেশি ক্রেতা ও পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল।
তবে পর্যটক বাড়লেও প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মারকুইস স্ট্রিটের একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জগবন্ধু সাহা বলেন, তাঁরা যে হারে পর্যটক বাড়বে বলে আশা করেছিলেন, বাস্তবে এখনো সে মাত্রায় বাড়েনি। তবে আগের তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।
তিনি জানান, চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে আসা অনেক মানুষ কলকাতার পরিবর্তে সরাসরি চেন্নাই, দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মতো শহরে যাচ্ছেন। এতে কলকাতার ব্যবসায়ীরা কিছুটা পিছিয়ে পড়ছেন। তবে আগস্টের মাঝামাঝি থেকে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশা করছেন তিনি। স্কুলের ছুটি ও পূজার মৌসুমকে কেন্দ্র করে তখন ভ্রমণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা বাংলাদেশি নাগরিক নাবিল রিয়াজ জসিমউদ্দিন জানান, তিনি কলকাতায় চিকিৎসাসেবা নিতে এসে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হননি। দুই দেশের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও পারস্পরিক যোগাযোগ আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশি পর্যটকদের প্রত্যাশা, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অস্বস্তি ধীরে ধীরে কেটে গিয়ে সম্পর্কের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে। এর ফলে চিকিৎসা ও পর্যটনের পাশাপাশি দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগও আরও বাড়বে এবং কলকাতার নিউ মার্কেটসহ পর্যটননির্ভর ব্যবসাগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরবে।