ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বী, ইতিহাসে জাপান–ব্রাজিলের অভিন্ন গল্প

আজ বিশ্বকাপ ফুটবলে নকআউট পর্বে মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল ও জাপান। মাঠের এই লড়াইয়ের বাইরে দুই দেশের সম্পর্ক ঘিরে রয়েছে শত বছরেরও বেশি সময়ের এক ব্যতিক্রমী ইতিহাস—যা অনেকটাই ‘উল্টো অভিবাসনের’ গল্প।
জাপানের বাইরে সবচেয়ে বেশি জাপানি বংশোদ্ভূত মানুষ বাস করেন ব্রাজিলে। দেশটিতে বর্তমানে ২০ লাখেরও বেশি নিক্কেই (জাপানি বংশোদ্ভূত) মানুষ বসবাস করছেন। অন্যদিকে জাপানে বসবাস করছেন প্রায় দুই লাখের বেশি ব্রাজিলিয়ান, যাদের অনেকেই সেই জাপানি অভিবাসীদের বংশধর।
জনসংখ্যার দিক থেকে ব্রাজিল জাপানের প্রায় দ্বিগুণ বড় দেশ। আয়তনেও বিশাল পার্থক্য রয়েছে—ব্রাজিল জাপানের তুলনায় প্রায় ২৩ গুণ বড়। তবে জনঘনত্বের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত: জাপান অনেক ঘনবসতিপূর্ণ, ব্রাজিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
এই সম্পর্কের সূচনা ১৯০৮ সালে। সে সময় জাপানে অর্থনৈতিক চাপ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ব্রাজিলে কফিবাগানে শ্রমিক সংকট—এই দুই কারণে শুরু হয় জাপানি শ্রমিকদের ব্রাজিলে অভিবাসন। ১৯০৮ সালের ১৮ জুন ‘কাসাতো-মারু’ নামের জাহাজে প্রথম ৭৯১ জন জাপানি শ্রমিক ব্রাজিলের সান্তোস বন্দরে পৌঁছান।
পরবর্তী কয়েক দশকে হাজার হাজার জাপানি ব্রাজিলে স্থায়ী হন। তবে ১৯৭০-এর দশকের পর এই অভিবাসন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু ইতিহাস আবার নতুন মোড় নেয় ১৯৯০-এর দশকে। তখন ব্রাজিল অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছিল এবং জাপানে শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছিল। ফলে শুরু হয় উল্টো অভিবাসন—ব্রাজিল থেকে জাপানে জাপানি বংশোদ্ভূতদের যাত্রা।
১৯৯০ সালে জাপান নতুন অভিবাসন নীতির মাধ্যমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের জাপানি বংশোদ্ভূতদের জন্য কাজের সুযোগ সহজ করে দেয়। এর ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই জাপানে ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত শ্রমিকের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
তবে এই অভিবাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পরিচয়ের সংকট। ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া অনেকেই সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ ব্রাজিলিয়ান হলেও জাপানে তারা ‘বিদেশি’ হিসেবে বিবেচিত হন। আবার ভাষা ও সংস্কৃতিগত দূরত্বের কারণে অনেকে পুরোপুরি জাপানেও একাত্ম হতে পারেননি।
প্রজন্মের পর প্রজন্মে ভাষা ও সংস্কৃতির এই দূরত্ব আরও বেড়েছে। প্রথম প্রজন্মে জাপানি ভাষা দক্ষতার হার ছিল প্রায় ৮৯ শতাংশ, যা পরবর্তী প্রজন্মগুলোতে ক্রমেই কমে এসেছে।
এই অভিবাসন ইতিহাসকে গবেষকরা ‘সার্কুলার মাইগ্রেশন’ বা বৃত্তাকার অভিবাসন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন—যেখানে একসময় শুরু হওয়া যাত্রা আবার উল্টো পথে ফিরে আসে।
ব্রাজিল–জাপানের এই শতবর্ষী সম্পর্ক দেখায়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনে মানুষের স্থানান্তর ঘটলেও সংস্কৃতি ও শিকড়ের টান কখনোই পুরোপুরি মুছে যায় না।