প্রকৃতির দারুণ সৃষ্টি ফক্সটেইল অর্কিড

রূপ ও রঙের বৈচিত্র্যে ফুলপ্রেমীদের কাছে এক রাজকীয় নাম ‘অর্কিড’। ঘরের কোণে, বারান্দায় কিংবা বাগানের টবে নান্দনিকতার ছোঁয়া আনতে অর্কিডের জুড়ি মেলা ভার। তবে চমৎকার এই ফুলটির সৌন্দর্য শুধুই ক্ষণিকের নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছরের প্রাচীন ইতিহাস এবং উদ্ভিদবিজ্ঞানের কিছু অবিশ্বাস্য রহস্য। গবেষকদের মতে, ডাইনোসরদের সমসাময়িক যুগ থেকেই পৃথিবীতে এই ফুল উদ্ভিদের অস্তিত্ব ছিল। আজ জেনে নেওয়া যাক অর্কিড জগতের এমন কিছু চমকপ্রদ তথ্য, যা সাধারণ মানুষকে রীতিমতো অবাক করবে।
ডাইনোসর যুগের প্রাচীন বাসিন্দা
উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও জীবাশ্মবিদদের গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীতে অর্কিডের আবির্ভাব আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি বছর পূর্বে! অর্থাৎ, যখন পৃথিবীতে ডাইনোসরদের রাজত্ব ছিল, তখনো কোনো কোনো বনাঞ্চলে এই অর্কিড ফুল ফুটত। কালের বিবর্তনে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও অর্কিড নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
প্রজাতির বিশাল বৈচিত্র্য: বিশ্ব বনাম বাংলাদেশ
সমগ্র বিশ্বজুড়ে অর্কিডের প্রজাতির সংখ্যা বিশাল। উদ্ভিদের এত বড় পরিবার খুব কমই দেখা যায়। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩০ হাজার প্রজাতির অর্কিড পাওয়া যায়। এদের প্রতিটি প্রজাতির রঙ, পাপড়ির গঠন এবং সুবাস একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
উপমহাদেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত কারণে এ অঞ্চলেও অর্কিডের ভালো ফলন দেখা যায়। আমাদের চিরসবুজ নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশেও প্রায় ২০০ প্রজাতির বুনো ও চাষযোগ্য অর্কিডের দেখা মেলে, যা আমাদের জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
ফুল ফোটে কয়েক ঘণ্টার জন্য, স্থায়িত্ব ৬ মাস!
অর্কিডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর স্থায়িত্ব। সাধারণ ফুল যেখানে ফোটার ১-২ দিনের মধ্যে ঝরে যায়, সেখানে অর্কিড এক অনন্য ব্যতিক্রম। কোনো কোনো প্রজাতির অর্কিড ফুল ফোটার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। আবার কিছু ডেনড্রোবিয়াম বা ফ্যালেনোপসিস প্রজাতির অর্কিড ফুল ফুটে টানা ৬ মাস পর্যন্ত গাছে তাজা ও সতেজ অবস্থায় থাকে! এই দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণেই বাণিজ্যিক ফুলচাষী ও সৌখিন বাগানীদের কাছে এর কদর সবচেয়ে বেশি।
ওজনে ৯০০ কেজি! পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্কিড
অর্কিড বলতেই সাধারণত আমরা টবে রাখা ছোট ছোট লতানো বা পরজীবী গাছকে বুঝি। কিন্তু পৃথিবীতে এমন অর্কিডও আছে যা আকারে একটি বিশাল গাছের সমান হতে পারে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্কিড প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম হলো 'গ্রামাটোফাইলাম স্পেসিওসাম' (Grammatophyllum speciosum)। এই দানবীয় অর্কিড গাছ ও ফুলসহ ওজনে প্রায় ৯০০ কেজি (প্রায় ১ টন) পর্যন্ত হতে পারে! সাধারণত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রেইনফরেস্ট বা গভীর বনে এই বিশালাকার অর্কিডের দেখা মেলে।
প্রকৃতির এই অনন্য সৃষ্টি অর্কিড আজ শুধু বনের শোভা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে এটি একটি লাভজনক বাণিজ্যিক পণ্য। ঘরের সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি মনকে প্রফুল্ল রাখতে বাড়ির ছোট্ট একটি কোণে এই সাড়ে ৮ কোটি বছরের প্রাচীন বিস্ময়কে অনায়াসেই ঠাঁই দেওয়া যেতে পারে।