বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
Natun Kagoj

বিশ্বের সবচেয়ে দামি মাংসের গল্প

বিশ্বের সবচেয়ে দামি মাংসের গল্প
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

খাবারের পেছনে মানুষ কত টাকাই বা খরচ করতে পারে? কিন্তু যদি বলা হয় মাত্র এক কেজি মাংসের দাম ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, তবে চমকে ওঠাই স্বাভাবিক। বিশ্বের সবচেয়ে দামী, বিলাসবহুল এবং অভিজাত মাংসের নাম ‘কোবে বিফ’। জাপানের বিখ্যাত এই গরুর মাংসের স্বাদ ও নরম টেক্সচার এতটাই অনন্য যে, একে বলা হয় ‘মাংসের জগতের হীরা’। বিশ্বের বড় বড় তারকা, ধনকুবের এবং ভোজনরসিকদের খাদ্যতালিকার শীর্ষে থাকে এই বিশেষ পদ। কিন্তু কী এমন আছে এই মাংসে, যার কারণে এর দাম সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে?

কোবে বিফ আসলে কী?

সব গরুর মাংসই কিন্তু কোবে বিফ নয়। জাপানের ‘হিয়োগো’ (Hyogo) অঞ্চলের রাজধানী ‘কোবে’ (Kobe) শহরের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। জাপানের বিশেষ প্রজাতির ‘ওয়াগিউ’ (Wagyu) গরুর মধ্যে ‘তাঝিমা-উশি’ (Tajima-ushi) নামক একটি নির্দিষ্ট ও বিশুদ্ধ রক্তধারার জাত থেকে এই কোবে বিফ পাওয়া যায়। এই গরুগুলোকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এবং বিশেষ যত্ন সহকারে লালন-পালন করা হয়।

কেন এই মাংসের এত দাম? (উৎপাদনের নেপথ্য রহস্য)

কোবে বিফের আকাশচুম্বী দামের পেছনে রয়েছে এর দীর্ঘ ও কঠোর উৎপাদন প্রক্রিয়া:

  • বিশেষ মার্বেলিং (Marbling): এই মাংসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘ইন্ট্রামাসকুলার ফ্যাট’ বা মার্বেলিং। মাংসের পরতে পরতে চর্বি এমনভাবে ছড়িয়ে থাকে, যা দেখতে অনেকটা সাদা মার্বেল পাথরের মতো নকশা তৈরি করে। এই চর্বির গলনাঙ্ক মানুষের শরীরের তাপমাত্রার চেয়েও কম। ফলে এই মাংস মুখে দেওয়া মাত্রই মাখনের মতো গলে যায়।

  • রাজকীয় লালন-পালন: লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, কোবে বিফের জন্য নির্ধারিত গরুগুলোকে নিয়মিত উন্নতমানের বিয়ার (Beer) পান করানো হয় এবং তাদের মাংসপেশি নরম রাখতে প্রতিদিন বিশেষ ম্যাসাজ (Massage) দেওয়া হয়। যদিও আধুনিক খামারিরা বলেন, সব খামারে বিয়ার দেওয়া না হলেও গরুর মানসিক চাপ কমাতে এবং ক্ষুধা বাড়াতে অত্যন্ত আরামদায়ক ও রাজকীয় পরিবেশে এদের রাখা হয়।

  • কঠোর কোয়ালিটি কন্ট্রোল: জাপানিজ শরিয়ত ও আইন অনুযায়ী, একটি গরুর মাংস ‘কোবে বিফ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে কিনা, তা নির্ধারণ করে একটি কঠোর গভর্নিং বডি। গরুর ওজন, চর্বির অনুপাত (Marbling Score) এবং মাংসের রঙ নিখুঁত হলেই কেবল তাকে ‘কোবে বিফ’-এর সিলমোহর দেওয়া হয়। বছরে মাত্র ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ গরু এই স্বীকৃতি পায়, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম।

বিশ্ববাজারে এর চাহিদা ও আভিজাত্য

কোবে বিফের সীমিত সরবরাহ এবং বিশ্বব্যাপী বিশাল চাহিদাই এর দাম বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। হংকং, নিউ ইয়র্ক, প্যারিস বা টোকিওর সিক্স-স্টার রেস্তোরাঁগুলোতে এই মাংসের এক ছোট টুকরো বা স্টেক (Steak) খেতে হাজার ডলার গুনতে হয়। জাপানের বাইরে আসল কোবে বিফ রপ্তানি করা অত্যন্ত সীমিত এবং প্রতিটি আসল কোবে বিফের সাথে একটি ১০ ডিজিটের ট্র্যাকিং নম্বর দেওয়া হয়, যা দিয়ে ওই গরুর বংশলতিকা এবং সেটি কোন খামারে বড় হয়েছে তা জানা সম্ভব।

ভোজনরসিকদের মতে, কোবে বিফ কেবল একটি খাবার নয়, এটি একটি লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স বা জীবনের অন্যতম সেরা এক অভিজ্ঞতা। রান্নার ক্ষেত্রেও এতে বাড়তি কোনো মসলা ব্যবহার করা হয় না; সামান্য লবণ আর গোলমরিচ দিয়ে হালকা সেঁকে (Sear) নিলেই তৈরি হয়ে যায় পৃথিবীর সবচেয়ে দামী এই রাজকীয় খাবার।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন