ট্রাফিক লাইটের তিন রঙের নেপথ্যের রহস্য কী?

সড়কপথে চলতে ফিরতে আমাদের প্রতিনিয়ত ট্রাফিক সিগন্যালের মুখোমুখি হতে হয়। সিগন্যাল বাতির লাল রঙ দেখলেই আমরা থেমে যাই, হলুদ রঙে প্রস্তুতির ইঙ্গিত পাই এবং সবুজ রঙে পুনরায় যাত্রা শুরু করি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ট্রাফিক সিগন্যালে কেন এই তিনটি নির্দিষ্ট রঙই ব্যবহার করা হয়? নীল বা বেগুনি নয় কেন? এর পেছনে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের গভীর যুক্তি এবং রেলওয়ের ইতিহাস।
লাল রঙের রহস্য: কেন এটি ‘থামো’ সংকেত?
পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী, লাল রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য (Wavelength) দৃশ্যমান বর্ণালীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এর ফলে লাল রঙ বায়ুমণ্ডলের ধূলিকণা বা কুয়াশার মধ্যে খুব বেশি বিচ্ছুরিত (Scatter) হয় না এবং অনেক দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। চালক যেন অনেক দূর থেকেই বিপদের সংকেত পেয়ে গাড়ি থামাতে পারেন, সেজন্যই লাল রঙকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঐতিহাসিকভাবে লাল রঙকে বিপদের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সবুজের বিবর্তন: যেভাবে হলো ‘যাও’ সংকেত
শুরুর দিকে রেলওয়ের সিগন্যালে সবুজ নয়, বরং সাদা রঙকে 'যাও' বা নিরাপদ সংকেত হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এতে একটি বড় বিপত্তি দেখা দেয়। সাদা বাতির লেন্স ভেঙে গেলে সেটি সাধারণ আলোর মতো মনে হতো, যা চালককে বিভ্রান্ত করত। এছাড়া রাতের অন্ধকারে আকাশের তারার আলোর সাথেও সাদা বাতি মিশে যাওয়ার ভয় ছিল। পরবর্তীতে সাদার পরিবর্তে সবুজকে বেছে নেওয়া হয়, কারণ সবুজের তরঙ্গদৈর্ঘ্য লালের পরে দৃশ্যমানতার দিক থেকে ভালো অবস্থানে থাকে এবং এটি চোখে প্রশান্তি দেয়।
হলুদের প্রয়োজনীয়তা: প্রস্তুতির ইঙ্গিত
হলুদ রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল রঙের কাছাকাছি, যা দূর থেকে সহজে চোখে পড়ে। শুরুতে ট্রাফিক সিগন্যালে কেবল লাল ও সবুজ ছিল। কিন্তু গাড়ি সরাসরি 'চলা' থেকে 'থামা' বা 'থামা' থেকে 'চলা' শুরু করলে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটত। এই রূপান্তর বা ট্রানজিশন পিরিয়ডকে নিরাপদ করতে হলুদ রঙের প্রবর্তন করা হয়, যা চালককে গাড়ি থামানোর প্রস্তুতি নিতে বা সাবধানে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
ইতিহাসের শুরু কোথায়
১৮৬৮ সালে লন্ডনে প্রথম ট্রাফিক সিগন্যাল চালু হয়। তখন গ্যাস বাতি ও হাতের সংকেত ব্যবহার করা হতো। পরে ১৯১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাফিক বাতি তৈরি হয়। এরপর ধীরে ধীরে আধুনিক তিন রঙের সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু হয়।
পদার্থবিজ্ঞান ও মানুষের দেখার ক্ষমতার কথা মাথায় রেখেই এই রঙগুলো নির্বাচন করা হয়েছে, যা আজ বিশ্বজুড়ে ট্রাফিক ব্যবস্থার এক সর্বজনীন ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।