মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

জাপানের মাইন-আকিয়োশিদাই পেল ইউনেস্কো স্বীকৃতি

জাপানের মাইন-আকিয়োশিদাই পেল ইউনেস্কো স্বীকৃতি
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সাদা চুনাপাথরের ছোট ছোট স্তূপ, যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে চরে বেড়াচ্ছে এক পাল সাদা ভেড়া। আর এই মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে ৪৫০টিরও বেশি গুহার এক রহস্যময় জগৎ। জাপানের ইয়ামাগুচি প্রিফেকচারের এই অনন্য ভূখণ্ড ‘মাইন-আকিয়োশিদাই’ এবার লাভ করল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। গত ২৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত সভায় ইউনেস্কো মাইন-আকিয়োশিদাইকে ‘গ্লোবাল জিওপার্ক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

জাপানের জন্য এটি ১১তম জিওপার্ক। এর আগে ২০২৩ সালে হাকুসান তেদোরিগাওয়া ১০ম জিওপার্কের মর্যাদা পেয়েছিল। এই ঘোষণার ফলে বিশ্বজুড়ে ইউনেস্কো গ্লোবাল জিওপার্কের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪১টিতে।

সাড়ে ৩৫ কোটি বছরের বিবর্তন

মাইন-আকিয়োশিদাই মালভূমির ইতিহাস যেন কল্পবিজ্ঞানের গল্পকেও হার মানায়। প্রায় সাড়ে ৩৫ কোটি বছর আগে এই অঞ্চলটি ছিল সমুদ্রের তলদেশের প্রবাল প্রাচীর। লক্ষ লক্ষ বছরের ভূ-গর্ভস্থ চাপ ও প্লেটের নড়াচড়ায় সেই প্রবাল একসময় সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে উঠে আসে। পরবর্তীতে বৃষ্টির পানি ও ভূগর্ভস্থ স্রোতের অ্যাসিডিক বিক্রিয়ায় চুনাপাথর গলে গিয়ে তৈরি হয় অদ্ভুত এই ‘কাস্ট’ ভূদৃশ্য।

মাটির নিচের বিস্ময়: আকিয়োশিদো গুহা

মাত্র ১০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই মালভূমিতে ছড়িয়ে আছে ৪৫০টিরও বেশি গুহা। এর মধ্যে প্রধান আকর্ষণ হলো জাপানের বৃহত্তম গুহা ‘আকিয়োশিদো’। মাটির প্রায় ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত এই ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ গুহার তাপমাত্রা সারা বছর ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে স্থির থাকে। এই গুহার ভেতরেই রয়েছে ১৫ মিটার উঁচু ও ৪ মিটার ব্যাসের দানবীয় স্ট্যালাকটাইট, যা ‘গোল্ডেন পিলার’ নামে পরিচিত।

সভ্যতার ইতিহাসে মাইনের অবদান

মাইন এলাকা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, জাপানি সভ্যতার ঐতিহ্যের সাথেও জড়িয়ে আছে। অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত নারা শহরের বিখ্যাত ‘তোদাইজি’ মন্দিরের মহাবুদ্ধ মূর্তির জন্য প্রয়োজনীয় তামা সরবরাহ করা হয়েছিল এই মাইনের নাগানোবোরি কপার মাইন থেকে। অর্থাৎ ১২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ভূমি জাপানের শিল্প ও সংস্কৃতির সাক্ষী হয়ে আছে।

‘ইয়ামায়াকি’ উৎসব: মানুষ ও প্রকৃতির মেলবন্ধন

এই অঞ্চলের চুনাপাথরগুলো সাদা দেখানোর পেছনে রয়েছে মানুষের এক অদ্ভুত ঐতিহ্য। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে স্থানীয়রা ‘ইয়ামায়াকি’ উৎসব পালন করেন, যেখানে পুরো ঘাসজমিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় বড় গাছ জন্মাতে পারে না, ফলে সাদা পাথরগুলো উজ্জ্বলভাবে দৃশ্যমান থাকে, যা পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

দক্ষিণ এশিয়ায় শূন্যতা

ইউনেস্কোর এই ঘোষণার পর একটি আক্ষেপের চিত্র ফুটে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে। বর্তমানে ৫১টি দেশে গ্লোবাল জিওপার্ক থাকলেও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা কিংবা বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত একটিও ইউনেস্কো স্বীকৃত গ্লোবাল জিওপার্ক নেই। অন্যদিকে চীনে ৪০টির বেশি এবং জাপানে ১১টি জিওপার্ক থাকা প্রমাণ করে প্রকৃতি সংরক্ষণে তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও যত্নের কথা।

মাইন-আকিয়োশিদাই কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি প্রকৃতির ৩৫ কোটি বছরের নীরব শ্রমের ফসল। ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি সেই অবিনশ্বর সৌন্দর্যকে বিশ্বদরবারে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিল।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ