বিআইডব্লিউটিএ’র আরিফ সিন্ডিকেট: ২ হাজার কোটির বালু আড়াই কোটিতে লোপাট

# বেনামী ঠিকাদারি ‘টোকিও মিল’ মহেশখালী চ্যানেলের মাটি লুটে নিল
# জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই ড্রেজিং বাণিজ্যের মহোৎসব
# রাতারাতি ভোল পাল্টালেন অতিরিক্ত পরিচালক আরিফ উদ্দিন
# সব ফাইলপত্র জব্দ করে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে দুদক,
মহেশখালী চ্যানেলে নদী খননের (ড্রেজিং) আড়ালে এক অবিশ্বাস্য ও অভূতপূর্ব লুটপাটের চিত্র বেরিয়ে এসেছে। মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নদী থেকে তোলা দুই হাজার কোটি টাকার সরকারি বালু ও মাটি মাত্র আড়াই কোটি টাকায় এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পকেটে তুলে দেওয়া হয়েছে। সরকারি সম্পদ এভাবে পানির দরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার এই মেগা জালিয়াতি এখন খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) টেবিলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ হরিলুটের মূল কারিগর বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত পরিচালক এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিন। এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে গত ৪ মার্চ দুদকের প্রধান কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দেন কক্সবাজারের ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলাম (সিআইপি)। এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সূত্র ধরেই মাঠে নেমেছে দুদকের বিশেষ টিম।
৬ কোটি ঘনফুট সরকারি মাটি গেল আড়াই কোটিতে!
মাতারবাড়ি পোর্ট এক্সেস রোড নির্মাণের জন্য মহেশখালী চ্যানেলের নূনিয়ারছড়া থেকে আদিনাথ মন্দিরের উজান এবং ঠাকুরতলা এলাকা পর্যন্ত বিশাল এলাকায় ড্রেজিং করা হয়। নদী খনন করে সেখান থেকে মোট ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট মূল্যবান বালু ও মাটি তোলা হয়।
উন্মুক্ত বাজারে যার প্রকৃত মূল্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। অথচ বিআইডব্লিউটিএ’র সিন্ডিকেট এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ মাত্র ২ কোটি ৭১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৮ টাকায় ‘টোকিও মিল জেভি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেয়। দরপত্র বা টেন্ডারের নিয়ম-কানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই পানির দর নির্ধারণ করা হয়, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সরাসরি এক বড় আঘাত।
এক নজরে হরিলুটের হিসাব:
- উত্তোলিত বালু ও মাটি: ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ (ছয় কোটি চৌত্রিশ লাখ উনষাট) হাজার ঘনফুট।
- প্রকৃত বাজারমূল্য: প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা।
- ঠিকাদার কিনেছে: মাত্র ২ কোটি ৭১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৮ টাকায়।
- সরকারি সর্বনিম্ন মূল্য: প্রতি ঘনফুট ৬.৯৪ টাকা।
- সিন্ডিকেটের বিক্রি করা মূল্য: প্রতি ঘনফুট মাত্র ২.৩৭ টাকা!
জেলা প্রশাসনকে অন্ধকারে রেখে ড্রেজিং বাণিজ্য!
একটি জেলার নদী বা চ্যানেলের মাটি ও বালু উত্তোলনের প্রধান আইনগত অভিভাবক হলো জেলা প্রশাসন ও ভূমি মন্ত্রণালয়। কিন্তু নতুন কাগজ অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহেশখালী চ্যানেলের এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ তোলার ক্ষেত্রে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কোনো বৈধ অনুমোদন বা ছাড়পত্র ছিল না।
প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট মিলে আইন কানুনের তোয়াক্কা না করেই এই বালু লোপাটের উৎসব শুরু করে। এই সম্পদ তোলার অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হলো, তা নিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যেও এখন ক্ষোভ ও রহস্য তৈরি হয়েছে।
মোবাইল কোর্টের নথিতেই লুকিয়ে ছিল চুরির প্রমাণ
বিআইডব্লিউটিএ’র এই সিন্ডিকেট ভেবেছিল তাদের জালিয়াতি চিরকাল ফাইলের নিচে চাপা থাকবে। কিন্তু গত বছরের ২ অক্টোবর এই এলাকায় পরিচালিত একটি মোবাইল কোর্টের (ভ্রাম্যমাণ আদালত) অভিযানে সব ওলট পালট হয়ে যায়। ওই অভিযানের সময় জব্দ করা মালামালের তালিকা, আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র এখন দুদকের হাতে এসেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল কোর্টের ওই নথিপত্র বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট বোঝা যায়, কীভাবে সরকারি সম্পদ বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াটিতে জালিয়াতি করা হয়েছে। নির্দিষ্ট একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে লাভবান করতে দরপত্রের মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ দেওয়ার নাটক সাজানো হয়েছিল।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার:
পরিচালক আরিফ উদ্দিনের দুর্নীতির জাল দুর্নীতির এই ভয়ংকর নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কর্মকর্তা এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনের খুঁটির জোর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি তার প্রথম জালিয়াতি নয়। এর আগে ঢাকা (সদরঘাট) ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে দায়িত্ব পালনের সময়ও তার বিরুদ্ধে নদী দখল এবং রাজস্ব ফাঁকির পাহাড়সম অভিযোগ ওঠে। তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে উচ্ছেদ অভিযানকে ঢাল বানিয়ে নিজস্ব সিন্ডিকেট তৈরির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দুদকের অনুসন্ধানে আরিফ উদ্দিনের যে সম্পদের খতিয়ান মিলেছে তা রূপকথাকেও হার মানায়। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে প্রায় ২২ কোটি টাকা মূল্যের একটি বহুতলা ভবন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং পাবনার সুজানগরে প্রায় ২০০ বিঘা জমির হদিস পাওয়া গেছে। বিগত সরকারের আমলে প্রভাব খাটিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এই কর্মকর্তা গত ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি নিজেকে অন্য আদর্শের লোক দাবি করে ভোল পাল্টে ফেলেছেন।
এ বিষয়ে জানতে ‘টোকিও মিল জেভি’-এর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা সরকারি নিয়ম মেনে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবেই কার্যাদেশ পেয়েছি। এখানে কোনো জালিয়াতি হয়নি।”
জানতে চাইলে দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ড্রেজিং ও বালু বিক্রির সব নথিপত্র আমাদের টিম প্রধান কার্যালয় থেকে তলব করে পর্যালোচনা করছে। জালিয়াতির প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নদী, বন্দর আর ড্রেজিংয়ের আড়ালে হাজার কোটি টাকা লোপাট করা এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার দাবি উঠেছে। নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দ্রুত সাময়িক বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শেষ পর্যন্ত এই রুই-কাতলারা পার পেয়ে যায় নাকি খাঁচায় বন্দি হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
বিআইডব্লিউটিএ-এর অতিরিক্ত পরিচালক এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা চেষ্টা করা হলে ও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।