নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিলা ও তার সিন্ডিকেটের বেপরোয়া বাণিজ্য

গণপূর্ত অধিদপ্তরের লাইসেন্স শাখায় চলছে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের প্রকাশ্য মহোৎসব। অভিযোগ উঠেছে, অধিদপ্তরের বিধি-বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী (ওএন্ডএম) সাকিলা ইসলাম একটি বিশাল সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। এই চক্রের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে ব্যাকডেটে লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন এবং যাচাই-বাছাই ছাড়াই নতুন ঠিকাদারি লাইসেন্স বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
সিন্ডিকেটের সদস্য ও লেনদেন প্রক্রিয়া
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাকিলা ইসলামের এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটে রয়েছেন অফিস সহকারী শিপন মিয়া ও আল-আমিন, উচ্চমান সহকারী অহিদুল ইসলাম, সুপার মো. আমিনুল ইসলাম এবং তাজুল, সুমন ও ফরহাদসহ আরও কয়েকজন।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, সাকিলা ইসলামের অবৈধ লেনদেনের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করছেন অবসরে যাওয়া অফিস সহায়ক মো. হান্নান। ভুক্তভোগীদের দাবি, সাকিলা ইসলামের চাকরির শুরু থেকেই হান্নান তার অবৈধ অর্থের সংগ্রাহক হিসেবে নিয়োজিত। লাইসেন্সভেদে একেকটি ফাইলের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এই টাকার বড় অংশ নির্বাহী প্রকৌশলী গ্রহণ করেন এবং বাকিটা সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করা হয়।
বিধি লঙ্ঘন ও ‘ব্যাকডেট’ জালিয়াতি
গত ১৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ ফিরোজ হাসান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ২০২৫-২৬ সনের তালিকাভুক্তির জন্য নির্দিষ্ট সময় ও নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, মাঠ পর্যায়ের তিন সদস্যের কমিটির যাচাই-বাছাইয়ের পর লাইসেন্স অনুমোদিত হওয়ার কথা। কিন্তু সাকিলা সিন্ডিকেট ক্ষমতার অপব্যবহার করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুপারিশ ছাড়াই সরাসরি লাইসেন্স প্রদান করছে।
বিশেষ করে ১৫৬১ ও ১৫৬২ স্মারকে অনেক লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। অভিযোগ রয়েছে, আবেদনের সময়সীমা পার হওয়ার পরও মানি রিসিট টেম্পারিং (জালিয়াতি) করে ব্যাকডেটে নতুন আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে। কেবলমাত্র জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিলেই প্রথম শ্রেণীর লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
তিন হাজার আবেদনের পেছনে বিশাল বাণিজ্য
২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় তিন হাজার নতুন লাইসেন্সের আবেদন জমা পড়ে। এই বিপুল সংখ্যক আবেদনকে কেন্দ্র করে দরকষাকষির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। অনেক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, পুরাতন লাইসেন্স নবায়ন করতে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ দিতে হয়। টাকা না দিলে লাইসেন্স শাখার ফাইল নড়ে না বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
বিলাসবহুল জীবন ও সম্পদের পাহাড়
লাইসেন্স শাখায় মাত্র এক বছর কাজ করেই এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ‘আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ’ বনে গেছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এবং নিজ নিজ জেলায় তাদের নামে বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও বিভিন্ন নির্বাহী অফিসের সিল জালিয়াতি করে এবং স্বাক্ষর নকল করে তারা এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ
দুর্নীতির পাশাপাশি নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিলা ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ উঠেছে, যা অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিলা ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি কিছু অনিয়মের কথা স্বীকার করলেও ঘুষের বিষয়টি অস্বীকার করেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ফিরোজ হাসান জানান, এ ধরনের কোনো অভিযোগের বিষয়ে তিনি অবগত নন।