পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বার খুলল, রূপপুরে ফুয়েল লোডিং শুরু

পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেল ৩টার দিকে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী বিশ্বের ৩৩তম দেশে পরিণত হলো। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রেখেই প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে এবং নিরাপত্তা বিষয়টিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্প বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।
প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, এই অর্জন দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ আশ্বাস দিয়ে বলেন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই এখান থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে এবং ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশ নেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি, যিনি প্রকল্পটির অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া থেকে পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান ঢাকায় পৌঁছায় এবং পরবর্তীতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রূপপুরে নিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। মোট ১৬৪টি জ্বালানি বান্ডিল আনা হয়েছে, প্রতিটিতে রয়েছে শত শত জ্বালানি রড।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল উপাদান ইউরেনিয়াম, যা বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করে রিঅ্যাক্টরে ব্যবহার করা হয়। রূপপুর প্রকল্পে নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন করে সেই তাপ থেকে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি জ্বালানি বান্ডিল ব্যবহার করা হবে, যা দিয়ে টানা প্রায় ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। পরবর্তীতে ব্যবহৃত জ্বালানির তেজস্ক্রিয় অংশ নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় রাশিয়ায় পাঠানো হবে।
প্রকল্পটি সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং প্রতিটি ধাপ নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা হয়েছে। জ্বালানি লোডিং শেষ হলে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ এবং ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ বছর, যা প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আরও বাড়ানো সম্ভব। এটি চালু হলে দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করছে রাশিয়া, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধ করা হবে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।