আওয়ামী থেকে বিএনপি, প্রভাবশালী পরিচয়ে শীর্ষ পদে শাহজামান

সরকারি প্রশাসনে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ভোল পাল্টানোর ঘটনা নতুন কিছু নয়, তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান (তুহিন)-এর রূপান্তর যেন সবকিছুকে হার মানিয়েছে।
১৯তম বিসিএস-এর মাধ্যমে চাকরিতে যোগদান করা এই কর্মকর্তা মেধাক্রম বা জ্যেষ্ঠতায় অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও (গ্রেডেশন নম্বর-৯৩৬) সবসময়ই ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থাকার কৌশল রপ্ত করেছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পশুপালন বিষয়ে ডিগ্রিধারী এই কর্মকর্তা ছাত্রজীবনে প্রথমে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, কিন্তু সুবিধাবাদী চরিত্রের কারণে দ্রুতই ভোল পাল্টে ছাত্রদলে নাম লেখান। চাকরিতে প্রবেশের পর থেকেই তার ক্যারিয়ারে জড়িয়ে আছে অসংখ্য অনিয়ম ও দুর্নীতির দাগ।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে তিনি ছিলেন তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমের অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং প্রভাবশালী নেতা মির্জা আজমের বিশেষ কৃপাধন্য। এমনকি মির্জা আজমের আধা-সরকারি পত্র বা ডিও লেটারের জোরেই তিনি জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পরিচালক পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছিলেন।
সেই সময় তিনি নিয়মিত মির্জা আজমের ধানমন্ডির বাসভবনে যাতায়াত করতেন এবং নিজেকে মন্ত্রীর নিকট আত্মীয় পরিচয় দিয়ে অধিদপ্তরে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তার এই আওয়ামী প্রভাবের প্রতিবাদে একসময় অধিদপ্তরের শত শত সাধারণ কর্মকর্তা বিক্ষোভ মিছিল পর্যন্ত করেছিলেন, কিন্তু ক্ষমতার দাপটে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন তুঙ্গে এবং সারা দেশে রক্তের হোলিখেলা চলছে, তখন এই শাহজামান খান তুহিন রাজধানীর কৃষি খামার সড়কে বঙ্গবন্ধু ভেটেরিনারি পরিষদের ব্যানারে আওয়ামী লীগের হয়ে শান্তি সমাবেশের সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, গত ৩০ ডিসেম্বর যখন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে সারা দেশের জাতীয়তাবাদী শক্তি শোকাহত ছিল, তখন শাহজামান খানের নেতৃত্বে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে বিশাল আনন্দ ভোজের আয়োজন করা হয়, যা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে আজও প্রমাণিত হবে।
কিন্তু ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই দুধর্ষ আওয়ামী সমর্থক কর্মকর্তা মুহূর্তেই ভোল পাল্টে ফেলেন। এখন তিনি নিজেকে বিএনপির এক অতি প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন এবং এই নতুন ঢাল ব্যবহার করে গত ৯ এপ্রিল ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের দায়িত্ব বাগিয়ে নিয়েছেন। বর্তমান প্রশাসনের শীর্ষ মহলে নিজেকে জাহির করতে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে উদ্দেশ্যমূলক ফটোসেশন করছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে নিজের ‘নতুন রাজনৈতিক পরিচয়’ ফলাও করে প্রচার করছেন।
এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির পাহাড় সমান অভিযোগও রয়েছে; সাভারে কর্মরত থাকাকালীন প্রশিক্ষণ ও আনুষঙ্গিক খাতের বরাদ্দকৃত অর্থের প্রায় ৪০ শতাংশ তিনি সরাসরি আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমের প্রভাব খাটিয়ে তিনি যোগ্যতার বাইরে একটি বিলাসবহুল পাজেরো জিপ গাড়ি নিজের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ নিয়েছিলেন এবং সরকারি অনুমতি ছাড়াই সেটি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে সরকারি কোষাগারের বিপুল অর্থ অপচয় করেছেন। কুমিল্লায় উপ-পরিচালক থাকাকালে কৃত্রিম প্রজনন সেবা কর্মীদের মালামাল বিতরণের বিনিময়ে মাসিক ভিত্তিতে ‘হাদিয়া’ আদায়ের মতো হীন কর্মকাণ্ডেও তিনি লিপ্ত ছিলেন বলে জানা যায়।
বর্তমানে অধিদপ্তরের সাধারণ ও সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা মনে করছেন, ৫ আগস্টের বিপ্লবের পরও যদি শাহজামান খানের মতো একজন ‘গিরগিটি’ চরিত্রের দুর্নীতিবাজ ও স্বৈরাচারের দোসর কর্মকর্তা শীর্ষ পদে বহাল থাকেন, তবে তা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। একজন চিহ্নিত সুবিধাবাদী কীভাবে রাতারাতি প্রভাবশালী নেতার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে পুরো অধিদপ্তরকে জিম্মি করে রেখেছেন, তা নিয়ে প্রশাসনের অন্দরে এখন বইছে সমালোচনার ঝড়।
দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে ও প্রশাসনের স্বচ্ছতা ফেরাতে এই বহুরূপী কর্মকর্তার অতীতের কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং তাকে বর্তমান পদ থেকে অপসারণ এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। শাহজামান খান তুহিনের এই রাজনৈতিক রূপান্তরের গল্প কেবল একটি দপ্তরের অনিয়ম নয়, বরং এটি গোটা ঘুণে ধরা প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক নগ্ন চিত্র যা অবিলম্বে সংস্কার হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা......চলবে