সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
Natun Kagoj
মৃত্যুকে ঘিরে ঘৃণার সংস্কৃতি

আমরা কোন সমাজে বাস করছি?

আমরা কোন সমাজে বাস করছি?
ছবি: এআই
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

একত্রিশ বছরের এক তরুণী—কনটেন্ট ক্রিয়েটর, অভিনেত্রী ও চিত্রনাট্যকার কারিনা কায়সার—লিভারের জটিল রোগে দীর্ঘ চিকিৎসার পর চেন্নাইয়ের ভেলোর খ্রিস্টান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান ১৫ মে রাতে। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক তারকা কায়সার হামিদের কন্যা হিসেবে পরিচিত কারিনা ডিজিটাল মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিচিত মুখ ছিলেন।

তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা ঘিরে নতুন করে সমাজে মানবিকতা, নৈতিকতা এবং অনলাইন আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শোক প্রকাশের পাশাপাশি কিছু পোস্টে উল্লাস, বিদ্বেষ এবং ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করে মৃত্যু উদযাপনের অভিযোগও সামনে এসেছে।

পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, কারিনার অসুস্থতার শুরু হয়েছিল সাধারণ জ্বর থেকে। পরে ধীরে ধীরে হেপাটাইটিস এ ও ই সংক্রমণজনিত জটিলতায় তাঁর লিভার ফেইলিউর হয়। রাজধানীর একটি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে চেন্নাইয়ে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যু এড়ানো যায়নি।

কারিনা কেবল কনটেন্ট ক্রিয়েটর নন, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কাজ করে অভিনয় ও চিত্রনাট্য লেখায়ও পরিচিতি পাচ্ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে তিনি বিনোদন অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর পর সামাজিক মাধ্যমে কিছু পোস্টে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে উল্লাস প্রকাশ এবং অশালীন মন্তব্য ছড়ানোর অভিযোগ ওঠে। ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্যে বলা হয়েছে, মৃত্যুর আগ থেকেই তাঁর স্বাস্থ্য সংকটকে ঘিরে বিদ্বেষমূলক পোস্টের প্রবণতা দেখা যায়, যা মৃত্যুর পর আরও বৃদ্ধি পায়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবাধিকার ও সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমে ধীরে ধীরে এক ধরনের “মানবিক বিচ্ছিন্নতা” তৈরি হচ্ছে, যেখানে ভিন্নমতের মানুষকে আর মানুষ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা মৃত্যু বা দুর্যোগকেও রাজনৈতিক বা আদর্শিক আনন্দে রূপ দিচ্ছে বলে তাদের পর্যবেক্ষণ।

একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে ধর্মীয় শব্দের অপব্যবহার নিয়েও। ইসলামি নীতিমতে মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান দেখানো এবং অশোভন মন্তব্য থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে বলে আলেমরা মত দেন। সে অনুযায়ী, মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ বা উল্লাস প্রকাশ ধর্মীয় দৃষ্টিতেও সমর্থিত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ধরনের আচরণ নতুন প্রজন্মের মানসিকতা ও সামাজিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঘৃণার বিস্তার বাস্তব জীবনের সহিংসতা ও সামাজিক বিভাজনকে আরও তীব্র করতে পারে বলে মত তাঁদের।

আইনগত দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ বা অবমাননাকর মন্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই ঘটনাকে ঘিরে সমাজে ভিন্নমত থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—মৃত্যুর মতো মানবিক বাস্তবতাকে ঘিরে ঘৃণা ও উল্লাসের সংস্কৃতি ক্রমশ উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে।

কারিনার মৃত্যু তাই কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং সামাজিক নৈতিকতা ও ডিজিটাল আচরণের ওপর একটি কঠিন প্রশ্নচিহ্নও রেখে গেছে—আমরা কি সত্যিই মানবিক সমাজ গড়ে তুলছি, নাকি ধীরে ধীরে তা হারিয়ে ফেলছি?


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন