বক্সার থেকে ভিলেন, ভিলেন থেকে কমেডিয়ান

নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশি সিনেমার দর্শকদের কাছে পর্দায় ‘কাবিলা’র উপস্থিতি মানেই ছিল এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তি ও ভয়। তিনি ক্যামেরার সামনে আসা মানেই গল্পের প্রেক্ষাপটে অশান্তি আর অন্ধকারের আগমন। ১৯৮৮ সালে ‘যন্ত্রণা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালি পর্দায় পা রাখা এই অভিনেতা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে ঢালিউডের অন্যতম শীর্ষ ও শক্তিশালী খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। পর্দায় তাঁর নিখুঁত বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চোখ দিয়ে হিংস্রতা ফুটিয়ে তোলা আর সংলাপ বলার আক্রমণাত্মক ভঙ্গি দর্শকের মনে গভীর দাগ কেটেছে।
কাবিলার অভিনয়জীবনের আড়ালে তাঁর ক্রীড়াজগতের সম্পৃক্ততার ইতিহাসটি অনেকের কাছেই বেশ চমকপ্রদ ও কম পরিচিত। তাঁর প্রকৃত নাম মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শামীম। কুষ্টিয়া জেলায় জন্ম নেওয়া এই অভিনেতার শৈশবের স্বপ্ন ছিল একজন ফুটবলার হওয়া। সেই স্বপ্নের টানেই তিনি একসময় আরামবাগ স্পোর্টিং ক্লাবে ফুটবল খেলেছেন। তবে ফুটবলে বড় কোনো স্বীকৃতি না পেলেও কাবিলা ছিলেন একজন জাতীয় পর্যায়ের বক্সার। তিনি বিখ্যাত ‘ব্রাদার্স ইউনিয়ন’ ক্লাবের হয়ে বক্সিং রিংয়ে লড়াই করেছেন। এই বক্সিংয়ের আগ্রাসী শারীরিক দক্ষতাই পরবর্তীতে তাকে সিনেমার অ্যাকশন দৃশ্যে অনন্য করে তোলে।
কাজী হায়াত পরিচালিত ছবিগুলোতে কাবিলা ছিলেন ভয়ংকরভাবে কার্যকর। নায়ক জসিমের সঙ্গে ‘বিশ্বনেত্রী’ ছবিতে রামদা হাতে শিক্ষিকাকে খুন করার দৃশ্য কিংবা ‘ত্রাস’ ছবিতে এমপির বখাটে ছেলে হয়ে তাঁর বেপরোয়া আচরণ ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। এছাড়া অবিনাশী নায়ক সালমান শাহর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ ও ‘বিচার হবে’ (কানা আজম চরিত্র) ছবিতে তাঁর অভিনয় ছিল অনবদ্য। ‘ইতিহাস’ কিংবা ‘দেশদ্রোহী’ ছবিতে মান্নার মুখোমুখি হওয়া কাবিলা খল গ্যালারিতে নিজের নাম আলাদা করে চিনিয়েছেন। এই শক্তিশালী অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘অন্ধকার’ চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ খল অভিনেতা হিসেবে তিনি সম্মানজনক ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ অর্জন করেন।
সাফল্যের পাশাপাশি কাবিলার ক্যারিয়ার বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ঢালিউডের একটি অন্ধকার সময়ে কিছু অশ্লীল চলচ্চিত্রে অত্যন্ত আপত্তিকর দৃশ্যে অভিনয়ের কারণে তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন, যা তাঁর সামাজিক ভাবমূর্তিকে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
পরবর্তী সময়ে কাবিলা খলনায়কের খোলস ছেড়ে ‘কমেডি’ বা কৌতুক চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় তাঁর কমেডি চরিত্রগুলো কিছু দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হলেও, সিনেমা বোদ্ধা ও মূল ধারার দর্শকদের একাংশের কাছে তা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সমালোচকদের মতে, খলনায়ক হিসেবে তাঁর যে স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ও ভীতিকর উপস্থিতি ছিল, সেটাই ছিল তাঁর আসল শক্তি। হাসানোর চেয়ে জোর করে হাসাতে চাওয়ার প্রবণতা তাঁর সেই চিরচেনা গম্ভীর ও ভয়ংকর আইডেন্টিটিকে ম্লান করে দিয়েছিল।
সময় বদলেছে, সিনেমার ধরণ বদলেছে, কিন্তু নব্বইয়ের দশকের সিনেমার প্রকৃত অনুরাগীদের কাছে কাবিলা আজও সেই দুর্দান্ত ও নিরেট ভিলেন—যার স্ক্রিন প্রজেকশন মানেই ছিল টানটান উত্তেজনা।
দৈএনকে/জে, আ