মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • বাংলাদেশ অধ্যায়ের ইতি টেনে আবেগঘন বিদায় বার্তা দিলেন কোচ ক্যাবরেরা ১১ বছরের শিশুর অন্তঃসত্ত্বা ঘটনায় পলাতক মাদ্রাসাশিক্ষক, ফেসবুকে ভিডিওতে নিজেকে নির্দোষ দাবি এভারটনের কাছে ড্র করে শিরোপার সমীকরণে পিছিয়ে গেল ম্যানচেস্টার সিটি, এগিয়ে আর্সেনাল রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ানোর পরিকল্পনা, শিগগিরই আসতে পারে নতুন সূচি বিজেপির উত্থান, মমতার দুর্গে ফাটল সংগ্রাম থেকে শাসনক্ষমতা: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের গল্প একই গ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় রিট শুনানি থেকে সরে দাঁড়ালেন বিচারক প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ রাজনৈতিক ইতিহাসে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের পথে বিজেপি
  • জীবনব্যাপী শিক্ষা হতে হবে নীতিগত কৌশলের অগ্রাধিকার

    জীবনব্যাপী শিক্ষা হতে হবে নীতিগত কৌশলের অগ্রাধিকার
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    জেনেভা (আইএলও নিউজ) -  ডিজিটালাইজেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সবুজ রূপান্তর এবং জনমিতিক পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এক নতুন প্রতিবেদনে সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, জীবনব্যাপী শিক্ষাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। 

    কর্মী জরিপ, অনলাইন চাকরির চাহিদা বিশ্লেষণ, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য এবং প্রশিক্ষণ কার্যকারিতা নিয়ে ১৭৪টি গবেষণার পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি ‘Lifelong Learning and Skills for the Future’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে চলমান ডিজিটাল, সবুজ ও জনমিতিক পরিবর্তন দেশগুলোর ভেতরে এবং এক দেশের সাথে আরেক দেশের বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

    আইএলও’র মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ. হংবো বলেন, “জীবনব্যাপী শিক্ষা বর্তমানের কাজ ও ভবিষ্যতের সুযোগের মধ্যে সেতুবন্ধন। এটি শুধু কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার বিষয় নয়; বরং শোভন কাজ নিশ্চিত করা, উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেওয়া এবং স্থিতিশীল সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এটি টেকসই উন্নয়ন কৌশলের একটি অপরিহার্য উপাদান।”

    পরিবর্তিত দক্ষতার চাহিদা ও বৈষম্যের ঝুঁকি
    কর্মক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তনের ফলে দক্ষতার চাহিদাও বদলে যাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও এআই কাজের ধরন পাল্টে দিচ্ছে, সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তর উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নতুন মাত্রা যোগ করছে। একই সঙ্গে জনসংখ্যার বার্ধক্য বাড়ায় অনেক অঞ্চলে সেবা খাতে চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রবীণ কর্মীদের ওপর চাপও বাড়ছে।
    প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ গত এক বছরে কোনো কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাতে স্থায়ী পদে নিযুক্ত পূর্ণকালীন কর্মীদের মধ্যে নিয়োগকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত এই ধরনের প্রশিক্ষণের  হার ৫১ শতাংশ। এই ব্যবধানটি শেখার সুযোগে স্পষ্ট বৈষম্যকে তুলে ধরে, বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের মধ্যে এবং বিভিন্ন শিক্ষাস্তরের ক্ষেত্রে।

    স্বল্প শিক্ষিত, অনানুষ্ঠানিক খাত বা ছোট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীরা মূলত কাজের মাধ্যমেই দক্ষতা অর্জন করেন, যেখানে অন্যরা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞ সহকর্মীদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পান। এটি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে, যা মানুষের কর্মজীবনের পুরো সময়জুড়ে কীভাবে দক্ষতা অর্জিত হয় সেটাকে আরও ভালোভাবে প্রতিফলিত করে।

    বাংলাদেশে আইএলও’র কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, “প্রতিবেদনের বৈশ্বিক প্রবণতাগুলো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নিয়োগদাতারা এখন প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি ‘সফট স্কিল’ সম্পন্ন কর্মী খোঁজেন। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা জরুরি, যাতে পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়।”
    শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়

    প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, শুধু প্রযুক্তিগত বা কারিগরি দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া যথেষ্ট নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং বিভিন্ন আয় স্তরের নিয়োগদাতারা এখন বিভিন্ন দক্ষতার সমন্বয় খুঁজছেন। মৌলিক চিন্তাশক্তি, সামাজিক-মানসিক ও ব্যবহারিক দক্ষতার পাশাপাশি ডিজিটাল ও পরিবেশবান্ধব দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের “সমন্বিত” দক্ষতার প্রোফাইলসম্পন্ন শ্রমিকরা তুলনামূলকভাবে বেশি মজুরি এবং উন্নত কর্মপরিবেশসম্পন্ন চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি রাখেন।

    অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপনের আই এল ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিজিটাল দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ, দলগত কাজ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার চাহিদা অনেক বেশি। ব্রাজিল, মরক্কো ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে সামাজিক-মানসিক দক্ষতার চাহিদা মোট চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি। মিসর, জর্ডান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও উরুগুয়েতে এই হার ৪০ শতাংশের বেশি। পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক ও কারিগরি দক্ষতার চাহিদাও ব্যাপক।
    এআই-সংক্রান্ত বিশেষ দক্ষতার চাহিদা এখনো তুলনামূলকভাবে কম হলেও ভবিষ্যতে তা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে অনেকেই সহজলভ্য এআই টুল ব্যবহার করছেন, যার জন্য বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। বরং, তারা ডিজিটাল জ্ঞান, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সামাজিক দক্ষতার মতো শক্তিশালী মৌলিক দক্ষতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। 

    আইএলওর হিসাবে, বিশ্বে প্রায় ৩২ শতাংশ কর্মী পরিবেশ–সম্পর্কিত কাজে যুক্ত। তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, সবুজ রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত সব কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শোভন কাজ নয়। সঠিক দক্ষতা ও নীতির সমন্বয় না থাকলে এসব নতুন সুযোগ উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত নাও করতে পারে।
    সেবা খাতে বাড়ছে চাহিদা

    বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি সেবা খাতে কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে - ২০২৩ সালে যেখানে সাড়ে ৮কোটি ছিল, তা ২০৫০ সালে ১৫.৮ কোটিতে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই খাতের অনেক বেতনভুক্ত কর্মী এখনো কম মজুরি ও অনুপযুক্ত কর্মপরিবেশে কাজ করেন। 

    নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে জীবনব্যাপী শিক্ষা
    প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনব্যাপী শিক্ষাকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মক্ষেত্র ও সামাজিকভাবে প্রসারিত করতে হবে।

    জীবনব্যাপী শিক্ষা  শুধু চাকরি পাওয়ার সক্ষমতা বা উৎপাদনশীলতা নয়; বরং এটি শোভন কাজ, উদ্ভাবন, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি। 
    তবে অনেক দেশেই শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো খণ্ডিত এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে ভুগছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ৩৪ শতাংশ দেশ প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষায় শিক্ষা বাজেটের ১ শতাংশের কম ব্যয় করে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই হার ৬৩ শতাংশ।

    উচ্চ আয়ের দেশগুলো সাধারণত উন্নত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সুবিধা পায়, তবে এখনো কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেমন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং শেখার সুযোগে অসম প্রবেশাধিকার। অন্যদিকে, অল্প আয়ের দেশগুলোতে আবার কাঠামোগত বাধা, যেমন পর্যাপ্ত অর্থায়নের ঘাটতি এবং দুর্বল অবকাঠামো শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তার ও কার্যকারিতাকে আরও সীমিত করে।

    প্রতিবেদনে সরকার, নিয়োগদাতা ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শেখার সুযোগ সম্প্রসারণ, শক্তিশালী প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং মানুষের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। একইসাথে প্রতিবেদনটি সুশাসন, সমন্বয়, অর্থায়ন এবং সামাজিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তাকেও তুলে ধরেছে। 

    প্রতিবেদনের সতর্কবার্তা - দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতের কর্মজগতের এই পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক কর্মীকে পিছিয়ে ফেলতে পারে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ