সংগ্রাম থেকে শাসনক্ষমতা: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের গল্প

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক অনন্য ও প্রভাবশালী নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন, সংগ্রাম ও দৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রাজ্যের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে।
১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট, জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে কলকাতার রাজপথে এক সাহসী তরুণীর দৃশ্য সবার নজর কাড়ে। সুতির শাড়ি পরা সেই তরুণী জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির বোনেটে উঠে প্রতিবাদ জানান। পরবর্তীতে সেই তরুণীই হয়ে ওঠেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজপথের আন্দোলনই শুরু থেকে তার রাজনীতির প্রধান শক্তি।
তবে তার পথচলা ছিল মোটেও সহজ নয়। মাত্র ১৭ বছর বয়সে বাবার মৃত্যু তাকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। চিকিৎসার অভাবে বাবার মৃত্যুর অভিজ্ঞতা তার মানসিকতা ও রাজনৈতিক চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে সংগ্রামী জীবনযাপন—এসবই তাকে গড়ে তোলে এক দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
কলেজজীবনেই ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৭০ সালে জোগমায়া দেবী কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্রী পরিষদের নেতৃত্ব দেন এবং নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে মহিলা কংগ্রেস (ইন্দিরা)-এর বঙ্গ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হন।
১৯৮৪ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে প্রবীণ বাম নেতা সোমনাথ চ্যাটার্জিকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো লোকসভা সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ওঠানামার মধ্য দিয়ে ১৯৯১ সালে আবার সংসদে ফিরে আসেন এবং দীর্ঘ সময় কলকাতা দক্ষিণ আসন ধরে রাখেন।
কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তার উত্থান ছিল উল্লেখযোগ্য। পি ভি নরসিমা রাও সরকারের সময় তিনি সবচেয়ে কমবয়সী মন্ত্রীদের একজন হন। পরে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে ১৯৯৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস।
১৯৯৯ সালে এনডিএ সরকারের সময় রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার উত্থান-পতনের মুখোমুখি হলেও তিনি বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন।
তার রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলন। ২০০৬ সালে সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে ২৬ দিনের অনশন এবং ২০০৭ সালে নন্দীগ্রামের ঘটনাবলি তাকে জনসমর্থনের শীর্ষে নিয়ে যায়।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি কন্যাশ্রী ও লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো সামাজিক কর্মসূচি চালু করেন, যা বিশেষ করে নারী ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলেছে। তবে তার শাসনামলে দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে এসে তার রাজনৈতিক অবস্থান আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পর বিরোধীদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। ভোট গণনায় ওঠানামার মধ্যেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন একাধারে সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও দৃঢ়তার প্রতিচ্ছবি—যেখানে প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বারবার নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন।