বিজেপির উত্থান, মমতার দুর্গে ফাটল

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছেন। ২০১১ সাল থেকে টানা মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এই নেত্রীর দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছে।
ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি ইতোমধ্যে ১৯৮টি আসনে জয়লাভ করেছে বা এগিয়ে রয়েছে। বিপরীতে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮৯টি আসন। বাকি আসনগুলোতে অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে বা জয়ী হয়েছেন। এই ফলাফল বহাল থাকলে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিজেপি এককভাবে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার জুড়ে ছিল জনমুখী নানা উদ্যোগ। কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথীর মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি তাকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। বিশেষ করে নারী ভোটব্যাংক গঠনে এসব প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাঠপর্যায়ে সরাসরি উপস্থিতি এবং ‘ঘরের মেয়ে’ ইমেজ তার রাজনৈতিক শক্তিকে আরও দৃঢ় করেছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক বিতর্ক এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ সংকট তৃণমূলের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, আর্থিক অনিয়ম এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ধীরে ধীরে জনমনে অসন্তোষ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে কেন্দ্র-রাজ্য দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক মেরুকরণও নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে, বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করে এসেছে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে শাসনবিরোধী মনোভাবকে পুঁজি করে তারা শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জাতীয় নেতৃত্বের সক্রিয় প্রচার, বিস্তৃত নির্বাচনী কৌশল এবং তৃণমূলের ভেতর থেকে একাধিক নেতার যোগদান দলটিকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোটার আচরণের পরিবর্তন। শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ভোটের ধারা বদলেছে, যা আগে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত ছিল। তরুণ ভোটারদের একটি অংশ পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। ‘মমতাহীন’ রাজনীতির ধারণা এখনো পুরোপুরি বাস্তব না হলেও, এই নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে—রাজনীতিতে কোনো অবস্থানই চিরস্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্ব, জনসমর্থন এবং ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যায়।
এখন দেখার বিষয়, এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় তৃণমূল কংগ্রেস কীভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন। একই সঙ্গে বিজেপি তাদের সম্ভাব্য নতুন শাসনামলে কতটা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, সেটিও হবে ভবিষ্যৎ রাজনীতির বড় প্রশ্ন।