এক পায়ে ভর করেই স্বপ্নের পথে মেঘলা

এক পায়ে ভর করেই সংগ্রাম করে যাচ্ছে মেঘলা খাতুন। লাফিয়ে লাফিয়ে কোনোভাবে কলেজে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও দারিদ্র্য ও সীমিত সুযোগ বারবার তার পথ আটকে দিচ্ছে। তবুও ইচ্ছাশক্তি আর মেধাকে সঙ্গী করে থেমে থাকতে নারাজ এই তরুণী।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার বাকুয়া গ্রামের ১৮ বছর বয়সী মেঘলা জন্মগতভাবেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার। তার একটি পা ছোট ও দুর্বল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন না। তবে এই সীমাবদ্ধতাই তাকে থামাতে পারেনি।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, মেঘলা হামিদা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৮৩ পেয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে তিনি একই প্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখায় বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত।
তবে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দারিদ্র্য। দিনমজুর বাবার আয়ে সংসার চালানোই কঠিন, ফলে মেয়ের পড়াশোনার খরচ ও যাতায়াত ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ কারণে তিনি নিয়মিত কলেজে যেতে পারেন না—মাসে মাত্র তিন থেকে চার দিন উপস্থিত থাকতে পারেন, বাকি সময় বাড়িতেই পড়াশোনা চালিয়ে যান।
মেঘলা বলেন, “আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। কিন্তু বাবার পক্ষে বই কেনা বা প্রতিদিন যাতায়াতের খরচ দেওয়া সম্ভব হয় না। কলেজে ফ্রি পড়ার সুযোগ পেয়েছি, শিক্ষকরা সহযোগিতা করেন। যদি একটি তিন চাকার স্কুটি পেতাম, তাহলে নিয়মিত কলেজে যেতে পারতাম।”
মেয়ের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তার মা আরজিনা খাতুন। তিনি বলেন, “মেয়ের জন্য কিছু করতে না পারার কষ্ট খুবই ভারী। কেউ সাহায্য করলে আমার মেয়ে স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।”
দিনমজুর বাবা আমির হোসেন জানান, “প্রতিদিন যা আয় করি তা সংসার চালাতেই চলে যায়। মেয়ের পড়াশোনা ও যাতায়াতের খরচ দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। একটি স্কুটি পেলে ও নিয়মিত কলেজে যেতে পারবে।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই মেঘলা মেধাবী ও পরিশ্রমী। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ সত্যিই অনুকরণীয়।
কলেজের শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, “মেঘলা অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী। আমরা তাকে সহায়তা করছি, তবে তার নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে যাতায়াতের ব্যবস্থা খুবই প্রয়োজন।”
এদিকে দ্য বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান ও পরিবেশকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, “এটি শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং সামাজিক দায়িত্বের বিষয়। সবাই এগিয়ে এলে মেঘলার মতো অনেক শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দেওয়া সম্ভব।”
অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সংগ্রামের প্রতীক মেঘলা এখন সমাজের সহানুভূতি ও সহযোগিতার অপেক্ষায়। একটি তিন চাকার স্কুটি তার শিক্ষাজীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন তিনি ও তার পরিবার।