কৃত্রিম অঙ্গের সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অঙ্গও সংবেদনশীল

আপনি নতুন কোনো নাচের স্টেপ শিখছেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, হুবহু মাইকেল জ্যাকসনের মতো মুনওয়াক করছেন! কিন্তু যদি কেউ তখন আপনার ভিডিও করে দেখায়, দেখবেন হাত-পা আসলে অদ্ভুতভাবে নড়ছে। আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের প্রতি একটি ধারণা তৈরি করে রাখে—কীভাবে হাঁটব, কীভাবে হাত নড়াব—যেমন এক অদৃশ্য মানচিত্র। সাধারণত, যত বেশি প্র্যাকটিস করি, এই মানচিত্র ও বাস্তব নড়াচড়া এক হয়ে যায়।
কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা একটি চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছেন। দেখা গেছে, যখন মানুষ রোবোটিক পা ব্যবহার করে হাঁটতে শেখে, তখন মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত খেলা খেলতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হেলেন হুয়াং ও তাঁর দল একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, মানুষ কৃত্রিম পা ব্যবহার করলে তাদের “বডি ইমেজ” বা শরীর সম্পর্কে ধারণা কেমন হয় তা বোঝা।
গবেষণায় ৯ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবককে বেছে নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের পা কাটা ছিল না। বরং একটি হাঁটুকে ৯০ ডিগ্রি ভাঁজ করে সেখানে হাই-টেক রোবোটিক পা লাগানো হয়। এরপর তাঁরা ট্রেডমিলে হাঁটতে শুরু করেন, রেলিং ধরা যাবে না এবং দ্রুত হাঁটতে হবে—যেমন বাস্তবিক চ্যালেঞ্জ।
প্র্যাকটিস চলল চার দিন ধরে। প্রতিদিন শেষে অংশগ্রহণকারীদের কিছু কম্পিউটার অ্যানিমেশন বা ভিডিও দেখানো হতো, যাতে বিভিন্ন হাঁটার ভঙ্গি প্রদর্শিত হয়। তাঁরা জিজ্ঞেস করা হতো, ‘আজ তুমি কোন ভিডিওর মতো হাঁটেছ?’
শুরুর দিকে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের ছোট করে দেখতেন। তারা ভাবতেন, হয়তো তাদের হাঁটা খুব খারাপ বা নড়বড়ে। কিন্তু বাস্তবে তাদের হাঁটা ততটা খারাপ ছিল না। ধীরে ধীরে, চার দিনের প্র্যাকটিস শেষে, তাদের হাঁটা উন্নত হলেও তারা নিজেদের অতিমূল্যায়ন করতে শুরু করলেন। ভিডিও দেখে তারা বললেন, ‘আমি তো একদম স্বাভাবিক মানুষের মতোই স্বচ্ছন্দে হাঁটছি!’—যদিও বাস্তবে হাঁটা এত নিখুঁত ছিল না।
অধ্যাপক হুয়াং বলেন, এই অতি-আত্মবিশ্বাস ভালো লক্ষণ নয়। কারণ, যদি মানুষ মনে করে তিনি পারফেক্ট, তাহলে আর নিজেকে শুধরানোর চেষ্টা করবেন না।
গবেষকরা দেখেছেন, এই বিভ্রান্তি ঘটে কারণ মানুষ যখন রোবটিক পা ব্যবহার করে, তখন তারা পায়ের দিকে খুব নজর দেয় না। বরং শরীরের উপরের অংশ সোজা আছে কি না, সেটাই খেয়াল করে। রোবটিক পা থেকে কোনো অনুভূতি না পাওয়ায় মস্তিষ্ক বুঝতে পারে, ‘আমরা নিশ্চয় সুন্দরভাবে হাঁটছি।’
অধ্যাপক হুয়াং মনে করেন, এই সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ভিজুয়্যাল ফিডব্যাক দেওয়া। অর্থাৎ, রোবটিক পা ব্যবহারকারীরা আয়না বা ভিডিওর মাধ্যমে নিজেদের হাঁটার আসল ছবি দেখলে, মস্তিষ্কের ভুল ধারণা ভেঙে যাবে।
গবেষণাটি কেবল বিজ্ঞান নয়, চিকিৎসাশাস্ত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে যারা কৃত্রিম পা ব্যবহার করবেন, তাদের হয়তো এমন স্ক্রিন দেওয়া হবে, যেখানে তারা নিজের হাঁটা দেখতে পারবেন। ফলে ভুল শুধরে তারা একদিন বাস্তবিকভাবে স্বাভাবিক মানুষের মতো হাঁটতে বা দৌড়াতে সক্ষম হবেন।
গবেষকরা এখন চেষ্টা করছেন, কীভাবে মানুষের নিজের নড়াচড়া সম্পর্কে আরও নিখুঁত ধারণা দেওয়া যায়। কারণ, নিজের ভুল জানা থাকলেই মানুষ সত্যিই নিখুঁত হতে পারে।
দৈএনকে/জে, আ