বিএনপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ: প্রধানমন্ত্রী

বিএনপির সব পরিকল্পনা ও কর্মসূচি জনগণের কল্যাণকে কেন্দ্র করেই তৈরি করা হয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
সোমবার (১০ আগস্ট) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো: নীতি, অংশীদারত্ব ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফায় দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার সঙ্গে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অনেক মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, এসডিজির অন্যতম মূলনীতি ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’। বর্তমান সরকারের নীতিতেও সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করা।
পাঁচ বছরের কৌশলগত কাঠামো
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। একই ধারাবাহিকতায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নেও সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে দেশের বিভিন্ন খাত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের কাজ চলছে।
দেশের মানুষের জীবনমান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এই কাঠামোকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সমন্বয় করা হয়েছে।
পাঁচ অগ্রাধিকারে উন্নয়নের পরিকল্পনা
সরকারের ‘সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ স্তম্ভে’ দারিদ্র্য কমানো, সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, নারী-পুরুষের সমতা এবং জলবায়ু সহনশীলতা তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
এর পাশাপাশি সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, এসডিজি বাস্তবায়ন এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অগ্রগতি ধরে রাখতে সরকার ‘পুনরুদ্ধার, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন’—এই তিন ধাপের কৌশল নিয়েছে। এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ
তারেক রহমান বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের সহায়তায় কৃষক কার্ড এবং স্বাস্থ্যসেবা সহজ করতে ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবার, প্রান্তিক কৃষক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া ক্রীড়া কার্ড এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিন গ্রামে পরীক্ষামূলক ‘এসডিজি ভিলেজ’
স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য দেশের তিনটি গ্রামকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগরকে এই কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হয়েছে।
এসব এলাকায় ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে ঋণ, শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যটন, কর্মসংস্থান, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি একসঙ্গে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে এসব উদ্যোগের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা হবে। সফল হলে দেশের অন্যান্য গ্রামেও এই মডেল সম্প্রসারণ করা হবে।
এসডিজি বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এসডিজি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিন দিনের জাতীয় সম্মেলনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অগ্রগতি, সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের লক্ষ্য
তারেক রহমান বলেন, সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি থাকতে হবে। মানবিক রাষ্ট্রে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকার সবার জন্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কল্যাণ রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও দায়িত্বশীল ও সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠান শেষে তিনি ‘এসডিজি ভিলেজ’ কার্যক্রমের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।