রাজ কাঁকড়া: নীল রক্তের ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’

প্রায় ৫৫ কোটি বছরের পুরনো একটি সামুদ্রিক জীবাশ্ম, যাকে হর্সশু ক্রাব বা অশ্বখুরাকৃতির কাঁকড়া বলা হয়, এবার বঙ্গোপসাগরেও দেখা গেছে। এটি প্রকৃত কাঁকড়া নয়, বরং মাকড়সা বা বিচ্ছুর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। অশ্বক্ষুরের মতো উপবৃত্তাকার শরীরের কারণে এদের ‘হর্সশু ক্রাব’ নামে ডাকা হয়।

এদের রক্ত অত্যন্ত দামী। রক্তে তামার পরিমাণ বেশি থাকার কারণে তা নীল রঙের হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর মূল্য অপরিসীম—প্রতি গ্যালন প্রায় ৫০ লাখ টাকায় বেচাকেনা হয়। এ রক্ত থেকে তৈরি ‘লাইসেট’ (LAL) টেস্টিং কিট ভ্যাকসিন ওষুধের বিষাক্ততা পরীক্ষায় ব্যবহার করা হয়।
গবেষকরা জানাচ্ছেন, এই প্রাণীর উত্স প্রায় ৭৫ কোটি বছর আগে এবং আদিকাল থেকে এদের রূপ প্রায় অপরিবর্তিত। অগভীর সমুদ্র, নরম বালি বা কাদা সমৃদ্ধ অঞ্চলে, বিশেষ করে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় এদের দেখা যায়।
তবে অত্যাধিক বাণিজ্যিক মূল্যের কারণে হর্সশু ক্রাব এখন বিলুপ্তপ্রায়। বাংলাদেশে রাজ কাঁকড়া নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু হয়েছে, যা দেশীয় ‘সুনীল অর্থনীতি’ (Blue Economy) বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনন্য অবদান
আপনি যদি কখনো ভ্যাকসিন (যেমন: কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন) বা কোনো ইনজেকশন নিয়ে থাকেন, তবে আপনি এই রাজ কাঁকড়ার কাছে ঋণী।
- ভ্যাকসিন পরীক্ষা: যেকোনো আধুনিক ওষুধ বা ভ্যাকসিনে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আছে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য রাজ কাঁকড়ার এই নীল রক্ত ব্যবহার করা হয়।
- অপারেশন সরঞ্জাম: হার্টের রিং বা কৃত্রিম অঙ্গ শরীরে বসানোর আগে তা জীবণুমুক্ত কি না, তা যাচাই করতেও এই রক্তের বিকল্প নেই।
অদ্ভুত গঠন ও জীবনচক্র
- দশটি চোখ: রাজ কাঁকড়ার শরীরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০টি চোখ থাকে, যা দিয়ে তারা অন্ধকার পানির নিচেও পথ চলতে পারে।
- লেজ বা টেলসন: এদের দীর্ঘ লেজটি কোনো অস্ত্র নয়; বরং উল্টে গেলে সোজা হওয়ার জন্য এটি তাদের লিভার হিসেবে কাজ করে।
- সাঁতার ও খাদ্যাভ্যাস: এরা মূলত উপুড় হয়ে সাঁতার কাটে এবং সমুদ্রের তলার পচা জৈব পদার্থ খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে।
হুমকির মুখে অস্তিত্ব
চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রয়োজনে প্রতি বছর প্রায় ৫ লক্ষ রাজ কাঁকড়া ধরা হয়। যদিও রক্ত সংগ্রহের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়, তবুও এর একটি বড় অংশ মারা যায়। বর্তমানে সমুদ্র দূষণ এবং চোরাচালানের কারণে এই প্রাচীন প্রাণীটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।