বঙ্গোপসাগরের গুপ্তধন: সমুদ্রজয় এখনো ‘কাগজে-কলমে’

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিজয় সত্ত্বেও বঙ্গোপসাগরের তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ এখনও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছে না। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা মামলার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে মামলায় জয়লাভের পর দেশের সার্বভৌম অধিকারের অধীনে ১,১৮,৮১৩ বর্গকিমি সমুদ্র অঞ্চলে সম্পদ অধিকার নিশ্চিত হয়।
এই বিজয় ছিল একটি চাবি; তবে চাবি পাওয়ার পরও দরজাটি খোলা যায়নি। মূল কারণ হিসেবে তাঁরা তুলে ধরেছেন তথ্যাভাব, আকর্ষণীয় ব্যবসায়িক চুক্তির অভাব, স্থানীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং ভূ-রাজনীতির জটিলতা।পুরো ব্যাপারটা বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনের টাইমলাইনে যেতে হবে:-
ঘটনার শুরু: ২০১০ সাল
খুব কৌশলে ভারত এবং মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যায় বাংলাদেশ। দুটো দেশই শুরুতে যেতে অনিচ্ছুক ছিল, কিন্তু বাংলাদেশ তাদের রাজি করায়। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, জিনিসটা এত গোপনীয় ছিল যে সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার আগে ভারত ও মিয়ানমার জানতোই না বাংলাদেশ আসলে কী করতে চলেছে। আমার বিবেচনায়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা কূটনীতির গল্প।
২০১২ ও ২০১৪ সাল: সমুদ্র জয়
২০১২ সালে মিয়ানমারের সাথে (ITLOS রায়) এবং ২০১৪ সালে ভারতের সাথে (PCA রায়) সমুদ্রসীমা মামলায় জয়লাভ করে বাংলাদেশ।
ফলাফল: বঙ্গোপসাগরে ১,১৮,৮১৩ বর্গকিমি সামুদ্রিক এলাকায় বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার নিশ্চিত হয়।
কী আছে এই সমুদ্রসীমায়?
তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুদ ছাড়াও এখানে আছে:
১. ভারী খনিজ বালু: কক্সবাজার–টেকনাফ উপকূলে ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকনের মতো মূল্যবান খনিজ শনাক্ত হয়েছে।
২. গ্যাস হাইড্রেট: গবেষণায় বঙ্গোপসাগরের তলদেশে বিপুল পরিমাণ ‘গ্যাস হাইড্রেট’-এর সম্ভাবনা দেখা গেছে, যা ভবিষ্যতের জ্বালানির এক বিশাল উৎস।
প্রশ্ন হলো: সমস্যাটা কোথায়?
বিজয়ের ১২ বছর পরেও কেন আমরা সমুদ্র থেকে কোনো খনিজ সম্পদ আহরণ করতে পারলাম না? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে বাস্তবসম্মত কারণগুলো পেলাম:-
১. সার্ভে ও নিখুঁত তথ্যের অভাবঃ
সমুদ্র জয়ের পর প্রধান কাজ ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ ‘মাল্টি-ক্লায়েন্ট সিসমিক সার্ভে’ করা। সঠিক ডাটা ছাড়া আন্তর্জাতিক কোনো কোম্পানি বিলিয়ন ডলার খরচ করে ড্রিলিং করতে চায় না। অথচ এই সার্ভে শুরু করতেই আমরা প্রায় এক দশক দেরি করে ফেলেছি।
২. আকর্ষণীয় চুক্তির অভাব (Model PSC):
গভীর সমুদ্র থেকে সম্পদ তোলা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার জন্য যে ধরনের 'মডেল পিএসসি' বা ব্যবসায়িক চুক্তি দরকার ছিল, তা দীর্ঘদিন আধুনিকায়ন করা হয়নি। ফলে এক্সন মবিল বা শেলের মতো বড় কোম্পানিগুলো শুরুতে আগ্রহ দেখায়নি।
৩. সক্ষমতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা:
গভীর সমুদ্র থেকে সম্পদ আহরণের মতো কারিগরি সক্ষমতা আমাদের দেশের (যেমন: বাপেক্স) নেই। আমাদের পুরোপুরি বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এই অতি-নির্ভরশীলতা এবং সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা আমাদের অনেক পিছিয়ে দিয়েছে।
৪. ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচ:
বঙ্গোপসাগর এখন বিশ্বশক্তিদের নজরদারিতে। ভারত, চীন এবং আমেরিকার ত্রিভুজ প্রেমের (কিংবা স্বার্থের) দ্বন্দ্বে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়েও হয়তো অনেক সময় বড় বড় প্রকল্পগুলো থমকে গেছে।
২০১২ এবং ২০১৪ সালের সেই ঐতিহাসিক বিজয় ছিল কেবল একটি চাবি পাওয়ার মতো। কিন্তু সেই চাবি দিয়ে আলীবাবার গোপন গুহার দরজা আমরা আজও খুলতে পারিনি। সম্পদ আমাদের পানির নিচেই পড়ে আছে, অথচ আমরা জ্বালানি সংকটে ভুগছি। সময় এসেছে কেবল সমুদ্র জয়ের উৎসবে মেতে না থেকে, সেই সম্পদকে দেশের অর্থনীতির 'গেম-চেইঞ্জার' হিসেবে কাজে লাগানোর।