প্রথম নারী ক্যাডেট পাইলট রোকসানার সাহসিকতার ইতিহাস

সুদূর নীল আকাশে পাখির মতো ডানা মেলে ওড়ার আজন্ম স্বাদ মানুষের। আমাদের অনেকেরই গ্রিক পুরানের ইকারুসের গল্প জানা আছে। ছোটবেলা থেকেই ছিল তার পাখির মতো আকাশে ওড়ার শখ। বড় হয়ে প্রাচীন গ্রিসে দেখলেন রাজার অত্যাচার। একটু পান থেকে চুন খসায় বাবা কারিগর ডিডেলাসসহ হলেন বন্দি। বন্দিশালায় বসে ইকারুস ও তার কারিগর পিতা ডিডেলাস বানিয়ে ফেললেন আজব এক মোমের পাখা। আর সেই মোমের পাখায় চেপে মুক্ত ইকারুস ও ডিডেলাস সাগরের উপর দিয়ে উড়ে চলছিলেন স্বাধীনতার পানে। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েই আকাশে ওড়ার আনন্দ যেন পেয়ে বসে ইকারুস কে।
উড়তে উড়তে আরও উপরে উঠলেন তিনি। যেন ছুঁয়ে দেখতে চান সূর্যটাকে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে সূর্যের প্রখর তাপে গলতে শুরু করে ইকারুসের পাখা। সূর্যের উত্তাপে মোমের পাখা গলে সমুদ্রে পড়ে প্রাণ হারান ইকারুস।
আজ আমরা জানবো আমাদের আদি অকৃত্রিম ঢাকাইয়া টিকাটুলির ভূমিকন্যা ইকারুস "তিতলী" সম্বন্ধে, যার পুরো নাম সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানা। তার পিতার নাম সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ।
টিকাটুলির অভয় দাস লেনে ছিল বনেদি ব্যবসায়ী সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর এক সুরম্য বাড়ি, নাম ‘তারাবাগ’। ওই বাড়িতেই ১৯৫৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জন্ম নিয়েছিলেন সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানা তিতলী। তার মায়ের নাম সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা। এই তিতলী'ই জীবনে অনেক চড়াই–উতরাই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট।
যিনি নারীদের জন্য প্রতিকূল লিঙ্গবৈষম্যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বন্দিদশা এড়িয়ে ছুঁতে চেয়েছিলেন আকাশটাকে। বেছে নিয়েছিলেন বৈমানিকের পেশা। সফলও হয়েছিলেন তিনি! কিন্তু শেষপর্যন্ত ভাগ্যের আনুকূল্য মেলেনি তার। ইকারুসের মোমের ডানার মতোই তিনিও বিগড়ে যাওয়া যন্ত্রপাখির ডানা খসে প্রাণ হারান।
রোকসানার যে সময়ে জন্ম, তখন পূর্ববঙ্গের সমাজব্যবস্থা ছিল ভীষণ রক্ষণশীল। তবে ‘তারাবাগ’–এর বেশির ভাগ মানুষ ছিলেন সংস্কৃতিমনা। তাই বাড়িতে শিল্প–সাহিত্যের নিয়মিত চর্চা হতো। ওই বাড়ির ছেলেমেয়েরা খেলাধুলায়ও ছিলেন প্রায় সমান পারদর্শী। তাঁরা লন টেনিস, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন, সাইক্লিং নানা ধরনের খেলাধুলায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন।
রোকসানা ১৯৬৯ সালে টিকাটুলির কামরুন্নেসা গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি ও ৭৩ সালে শেরে বাংলা গার্লস কলেজ (আগের নাম নারী শিক্ষা মন্দির) থেকে এইচএসসি পাস করেন। বৃত্তি নিয়ে জার্মানিতে মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেলেও যাননি শুধু পাইলট হবেন বলে। পরে ইডেন কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে বিএসসি পাস করেন। স্প্যানিশ, জার্মান, ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায়ও সমান দক্ষ
বৈমানিক হওয়ার স্বপ্ন ছোটবেলা থেকেই। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য রোকসানা ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাবে ভর্তি হন। কঠোর পরিশ্রমের ফলে দুই বছরের মাথায় ১৯৭৮ সালে পেয়ে যান কমার্শিয়াল বিমান চালানোর লাইসেন্স। তাঁর দক্ষতা ও সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে দুই বছরের মাথায় ফ্লাইং ক্লাবে ‘ইনস্ট্রাক্টর’–এর দায়িত্ব পান। ফ্লাইং ক্লাবে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করলেও তাঁর লক্ষ্য ছিল, যে করেই হোক বিমানে পাইলট হিসেবে ঢোকা। একদিন ১৯৭৮ সালের ১৯ নভেম্বর ক্যাডেট পাইলট নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয় বাংলাদেশ বিমান। ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ওই পরীক্ষায় রোকসানা সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। তবে নারী হওয়ায় কর্তৃপক্ষ তাঁর নিয়োগ আটকে দেয়। ১৯৭৯ সালের ২৫ মে ক্যাডেট পাইলট হিসেবে নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ বিমান আরেকটি বিজ্ঞপ্তি দেয়। সেখানে বলা হয়, শুধু পুরুষ প্রার্থীরাই আবেদন করতে পারবে। অর্থাৎ নারীরা আবেদনই করতে পারবে না। সেই ঘটনা তাঁকে প্রতিবাদী করে তোলে।
যোগ্যতা সত্ত্বেও নিয়োগ না পাওয়া এবং বিজ্ঞপ্তিতে নারীদের পাইলট হিসেবে আবেদনের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়গুলো উল্লেখ করে রোকসানা ১৯৭৯ সালের ৩১ মে দৈনিক ইত্তেফাকে রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে ‘খোলাচিঠি’ লেখেন। শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ বিমান বনাম মহিলা বৈমানিক’। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সংসদের নারী সদস্যদের উদ্দেশে লেখা দীর্ঘ চিঠিতে বিমানের ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি যে নারী–পুরুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছিল, সেটি বিস্তারিত তুলে ধরেন। চিঠিতে রোকসানা লেখেন, ক্যাডেট পাইলট হিসেবে পরীক্ষায় অন্য ছেলেদের চেয়ে তাঁর ফ্লাইং আওয়ার (বিমান চালানোর ঘণ্টা) তুলনায় বেশি ছিল। ককপিটে নারীদের দেখতে না চাওয়া বিমান কর্তৃপক্ষের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে ধিক্কার জানান। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, তৎকালীন রাষ্ট্রপতির নির্দেশ সত্ত্বেও বিমানের দুই–তিনজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নারীবিদ্বেষী আচরণের কারণে তাঁকে নারী ক্যাডেট পাইলট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
সবশেষে রোকসানা চিঠিতে লিখলেন, ‘আমি ওপেন চ্যালেঞ্জ দিয়েছি যে মহিলা হিসেবে আমি একবিন্দু সুবিধা চাই না বা কোটার সমর্থকও আমি নই, যদি আমি পুরুষদের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারি, তবে শুধু মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়ার জন্য আমাকে যেন আমার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা না হয়।’
রোকসানার সেই চিঠি ইত্তেফাকে ছাপা হওয়ার পর সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়। উত্তপ্ত আলোচনা জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গড়ায়। নারী সংসদ সদস্য, অধিকারকর্মী, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকসহ প্রগতিশীল মানুষেরা তাঁর সমর্থনে এগিয়ে আসেন। অবশেষে সরকারের হস্তক্ষেপে বিমান কর্তৃপক্ষ তাদের বিজ্ঞপ্তিতে ‘লিঙ্গবৈষম্যের’ শর্ত তুলে নিতে বাধ্য হয়। পরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানা বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্যাডেট পাইলট হিসেবে নিয়োগ পান।
কিন্তু পাইলট রোকসানার নীল আকাশে ডানা মেলে ওড়া বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তিনি ক্যাডেট পাইলট থেকে প্রমোশন পেয়ে ফার্স্ট অফিসার হন। এরপর অপেক্ষায় ছিলেন ক্যাপ্টেন হওয়ার। দেখতে দেখতে চলে যায় ৪ বছর ৮ মাসের মতো। এরই মাঝে ঘটে হৃদয়বিদারক বিমান দুর্ঘটনা। ১৯৮৪ সালের ৪ আগস্ট চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে ফকার–২৭ বিমানে করে ঢাকায় জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির মধ্যে পড়েন। ওই দিন বিমানের মূল পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন কায়েস আহমদ মজুমদার এবং কো–পাইলট ছিলেন ফার্স্ট অফিসার কানিজ ফাতেমা রোকসানা। তীব্র বাতাসের কারণে তাঁরা রানওয়েতে দুই দফা ল্যান্ড করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তৃতীয় দফায় অবতরণের জন্য কন্ট্রোল টাওয়ারের কাছ থেকে নির্দেশ পাওয়ার পরই বিমানটির সঙ্গে কন্ট্রোল টাওয়ারের বেতার সংযোগ পুরোপুরি ‘বিচ্ছিন্ন’ হয়ে যায়। এ কারণে বেলা ২টা ৩৫ মিনিটের দিকে কুয়াশার মধ্যে ওপর থেকে বাউনিয়া বিলকে ‘রানওয়ে’ মনে করে ল্যান্ড করতে গিয়ে ‘মিস জাজমেন্ট’ হয়। বিধ্বস্ত হয়ে বিমানটি ২০ থেকে ২৫ ফুট পানির নিচে ডুবে যায়। ওই দুর্ঘটনায় ৪৪ জন যাত্রী, দুই পাইলট, তিন ক্রুসহ ৪৯ জনের সবার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের ভেতরে তখন পর্যন্ত সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনা।
কানিজ ফাতেমা রোকসানার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে ২৯ বছর বয়সে। পাইলট রোকসানা বাংলাদেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে পথিকৃৎ। এ দেশের নারীরাও যে ফ্লাইং করতে জানেন, তা তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। তাঁর দেখাদেখি এখন অনেক নারী পাইলট হচ্ছেন। নারীরা এই পেশায় বেশ ভালো করছেন। বিমান চালানোর প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা পাইলট সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানার জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে বিমানের মধ্যেই। অদম্য সাহসী সেই নারী শুধু নিজেই ডানা মেলে আকাশে ওড়েননি, তাঁকে দেখে উড়তে শিখেছেন পরবর্তী প্রজন্মের সাহসী নারীরাও।