সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
Natun Kagoj

নীরব ঘাতক হাইপারটেনশনে ঝুঁকিতে নারীর জীবন

নীরব ঘাতক হাইপারটেনশনে ঝুঁকিতে নারীর জীবন
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

নব্বইয়ের দশকে বা তারও আগে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনকে কেবলই বয়স্ক পুরুষদের রোগ মনে করা হলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাম্প্রতিক চিকিৎসা গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, নারীদের মধ্যে এই ‘নীরব ঘাতক’ বা উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বেশিরভাগ নারীই জানেন না যে তারা এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত। কোনো স্পষ্ট উপসর্গ না দেখিয়েই এটি নীরবে হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক এবং কিডনি বিকলের মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসকে সামনে রেখে দেশের শীর্ষস্থানীয় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা নারীদের এই বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন।

কেন নারীদের ঝুঁকি বাড়ছে?

মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং হরমোনজনিত বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে হাইপারটেনশনের ঝুঁকি পুরুষদের চেয়ে ভিন্ন মাত্রায় কাজ করে:

  • পারিবারিক ও মানসিক চাপ: শহুরে কিংবা গ্রামীণ—উভয় সমাজেই নারীদের সংসার, কর্মক্ষেত্র ও সন্তান লালন-পালনের বহুমুখী মানসিক চাপ (Stress) সামলাতে হয়। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

  • হরমোনের পরিবর্তন ও মেনোপজ: সাধারণত ৫০ বছর বয়সের পর বা মেনোপজের (মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া) পর নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এই হরমোনটি ধমনীকে সুরক্ষিত রাখে। এর ঘাটতি হলেই নারীদের রক্তচাপ দ্রুত বাড়তে শুরু করে।

  • গর্ভাবস্থায় জটিলতা: গর্ভকালীন সময়ে অনেকের উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্রি-এক্লাম্পসিয়া’ বলা হয়। সন্তান প্রসবের পর এটি সাময়িক ঠিক হলেও, পরবর্তী জীবনে ওই নারীর স্থায়ী হাইপারটেনশনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

  • অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা ও স্থূলতা: ফাস্টফুড বা জাঙ্ক ফুড খাওয়ার প্রবণতা, খাবারে অতিরিক্ত কাঁচা লবণ ব্যবহার, এবং কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের অভাব নারীদের স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কেন একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়?

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপের সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ শুরুতে থাকে না। অনেকেই সামান্য মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা ঘাড় ব্যথাকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। অথচ ভেতরে ভেতরে এটি ধমনীর দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত করে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD)-এর পথ সুগম করে। অনেক নারী যখন প্রথমবার চিকিৎসকের কাছে যান, ততক্ষণে শরীরের ভেতরের কোনো না কোনো অঙ্গ বড় ধরণের ক্ষতির শিকার হয়ে পড়ে।

সুরক্ষায় বিশেষজ্ঞদের জরুরি পরামর্শ

এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে বাঁচতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নারীদের দৈনন্দিন জীবনে কিছু নিয়ম মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন:

১. নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা: ৩০ বছর বয়সের পর প্রত্যেক নারীর বছরে অন্তত দুই থেকে তিনবার রক্তচাপ (Blood Pressure) মাপা উচিত।

২. লবণ খাওয়া কমানো: তরকারিতে লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি পাতে বাড়তি কাঁচা লবণ খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।

৩. ওজন ও ডায়েট নিয়ন্ত্রণ: খাবারে শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত পদের পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।

৪. শারীরিক পরিশ্রম: দৈনিক অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

৫. গর্ভকালীন সতর্কতা: গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করা বাধ্যতামূলক।

চিকিৎসকদের স্পষ্ট বার্তা—উচ্চ রক্তচাপ মানেই জীবন শেষ নয়। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে একদম স্বাভাবিক ও দীর্ঘ জীবনযাপন করা সম্ভব। ভয় না পেয়ে সচেতনতাই এখানে প্রধান রক্ষাকবচ।


দৈএনকে/জে, আ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন