সাদা-কালো পর্দা থেকে কয়েক দশক, নাসিমা খানের অভিনয়জীবন

১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় নাসিমা খানের। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটিতে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। চিত্রনাট্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। এতে আরও অভিনয় করেন তৃপ্তি মিত্র ও খান আতাউর রহমানসহ অনেকে। ছবিটি ১৯৫৯ সালের মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপদক অর্জন করে।
প্রথম ছবির পরই অভিনয়ের আরও সুযোগ আসে নাসিমা খানের সামনে। বেবী ইসলাম পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘তানহা’য় অভিনয় করেন তিনি। ছবিটিতে তাঁর সহশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন শামীম আরা, সুমিতা দেবী ও শবনম।
১৯৬১ সালে সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘যে নদী মরু পথে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর পরিচিতি বাড়তে থাকে নাসিমা খানের। এরপর ‘সূর্যস্নান’ ছবিতে অভিনয় তাঁকে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে সহায়তা করে। ষাটের দশকে বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষার চলচ্চিত্রেই নিয়মিত অভিনয় করেছেন তিনি।
নাসিমা খানের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘ধারাপাত’, ‘কার বউ’, ‘উজালা’, ‘বেগানা’, ‘আপন দুলাল’, ‘উলঝন’, ‘ম্যায় ভি ইনসান হু’, ‘দুই ভাই’, ‘গৌরী’, ‘আমার বৌ’ ও ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’। এসব ছবিতে আনোয়ার হোসেন, হাসান ইমাম, রহমান, গোলাম মুস্তাফা ও আজিমসহ অনেক অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
ঢাকার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে নির্মিত ছবিতেও দেখা গেছে নাসিমা খানকে। পাকিস্তান ফিল্ম ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, লাহোরে নির্মিত তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘নয়ি লায়লা নয়া মজনু’ (১৯৬৯), ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’ (১৯৬৯), ‘আঁসু বন গয়ে মোতি’ (১৯৭০) ও ‘রোড টু সোয়াত’ (১৯৭১)। এর মধ্যে ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’ ছবির প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
স্বাধীনতার পর একসময় চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান নাসিমা খান। পরে টেলিভিশনে উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে আবার পর্দায় ফেরেন। এরপর চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকেও অভিনয় করেন তিনি। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের শেষ দিকে অবশ্য তাঁকে পর্দায় তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
পরবর্তী সময়ে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘মাতৃত্ব’, ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ ও ‘মাটির পিঞ্জিরা’। বাংলা মুভি ডেটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মাটির পিঞ্জিরা’ ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন তিনি।
১৯৯০ সালে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত এক আত্মকথনে নিজের অভিনয়জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন নাসিমা খান। চলচ্চিত্র সমালোচক মাহমুদা চৌধুরীর অনুলিখিত সেই স্মৃতিচারণা ২০২৫ সালে পুনঃপ্রকাশ করে বাংলা মুভি ডেটাবেজ।
স্মৃতিচারণায় ‘সূর্যস্নান’ ছবির শুটিংয়ে আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা, ‘কার বউ’ ছবিতে সিঁড়ি থেকে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনা এবং জহির রায়হানের ‘দুই ভাই’ চলচ্চিত্রের টানা শুটিংয়ের স্মৃতি উঠে আসে। ষাটের দশকের চলচ্চিত্রাঙ্গনে শিল্পীদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অভিনয়ের প্রতি তাঁদের নিষ্ঠার কথাও তুলে ধরেছিলেন তিনি।
তখন অভিনয়ের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ ছিল সীমিত। অভিজ্ঞ শিল্পী ও পরিচালকদের কাছ থেকে অভিনয়ের নানা কৌশল শিখেছেন বলে আত্মকথনে উল্লেখ করেছিলেন নাসিমা খান।
সাদা-কালো চলচ্চিত্রের যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক দশক অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অবদান রাখা ঢাকার চলচ্চিত্রের প্রথম প্রজন্মের আরেকজন অভিনেত্রীর জীবনাবসান হলো।