অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ড

ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার জন্য ২০২৬ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই অর্থনীতিবিদ রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ড। সোমবার রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস তাদের নাম ঘোষণা করেছে।
পুরস্কার ঘোষণায় বলা হয়, ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি’ বিষয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাদের এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, ব্যক্তি, পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের আর্থিক সিদ্ধান্ত কীভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে এবং সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কীভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে।
অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতি। ব্যষ্টিক অর্থনীতিতে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয়, সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং কর্মী নিয়োগের মতো সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করা হয়। অন্যদিকে, সামষ্টিক অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, সুদের হার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো বৃহত্তর বিষয় নিয়ে কাজ করে।
এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে যোগসূত্র ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে অর্থনীতির মন্দা, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বুঝতে গবেষণাটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৪৩ সালে জন্ম নেওয়া রবার্ট হল স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এমেরিটাস অধ্যাপক এবং হুভার ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো। কর্মসংস্থান, মুদ্রাস্ফীতি, ভোক্তাদের ব্যয় এবং অর্থনৈতিক উত্থান-পতন নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি পরিচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চক্র বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে হলের। তিনি ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের বিজনেস সাইকেল ডেটিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা কখন শুরু হয় এবং কখন শেষ হয়, তা নির্ধারণে কমিটিটি ভূমিকা রাখে।
১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া মাইকেল উডফোর্ড কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক। আধুনিক মুদ্রানীতি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি পরিচিত একটি নাম। সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তার গবেষণা অর্থনীতিবিদদের চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলেছে।
বিশেষ করে নয়া কেইনসীয় অর্থনীতিতে অবদানের জন্য পরিচিত উডফোর্ড। ২০০৩ সালে প্রকাশিত তার বই ‘ইন্টারেস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস: ফাউন্ডেশনস অব আ থিওরি অব মনিটারি পলিসি’ মুদ্রানীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও যোগাযোগও অর্থনৈতিক আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে—উডফোর্ডের গবেষণায় বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। যেমন, কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘ সময় সুদের হার কম রাখার ইঙ্গিত দিলে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগেই ব্যয় ও বিনিয়োগের পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে পারে। ‘ফরোয়ার্ড গাইডেন্স’ নামে পরিচিত এই কৌশল ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর মুদ্রানীতি প্রণয়নে বিশেষ গুরুত্ব পায়।
অর্থনীতিতে নোবেল হিসেবে পরিচিত এই পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক নাম ‘আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে সভেরিজেস রিক্সব্যাংক পুরস্কার’। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৯৬৮ সালে এটি চালু করে এবং ১৯৬৯ সালে প্রথমবারের মতো প্রদান করা হয়। আলফ্রেড নোবেলের মূল উইলে এই পুরস্কারের উল্লেখ ছিল না। তবে অন্য নোবেল পুরস্কারের মতোই এটি রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের মাধ্যমে দেওয়া হয়।
এবারের পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ডের মধ্যে এই অর্থ ভাগ করে দেওয়া হবে। আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে।