দখলদারদের কবজায় চরফ্যাশনের ফুটপাত

ভোলার চরফ্যাশন পৌর শহরের ফুটপাত এখন আর পথচারীদের নয়, ব্যবসায়ীদের দখলে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব সড়কের ফুটপাতজুড়ে বছরের পর বছর ধরে চলছে কোটি টাকার বাণিজ্য। ফলে শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও সাধারণ পথচারীদের বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। প্রশাসনের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা সড়ক ছেড়ে গেলেও স্থায়ী ব্যবসায়ীদের দখলে থাকা ফুটপাত এখনো সাধারণ মানুষের জন্য কার্যত অচল।
সম্প্রতি সরেজমিনে চরফ্যাশন পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সরকারি ট্যাফনাল ব্যারেট মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রধান সড়ক থেকে বিআরডিবি চত্বর পর্যন্ত দীর্ঘ অংশের ফুটপাত ব্যবসায়িক মালামালে ভরা। কোথাও দোকানের পণ্য, কোথাও নির্মাণসামগ্রী, আবার কোথাও ফুটপাত ও সড়কের ওপরেই চলছে স্টিল, লোহা ও আসবাবপত্র তৈরির কাজ।
শুধু তাই নয়, মোটরসাইকেল ধোয়া, গাড়ির ইঞ্জিন মেরামত, গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণ এবং ওয়েল্ডিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজও প্রকাশ্যে চলছে সড়কের একাংশ দখল করে। এতে পথচারীদের চলাচল যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।
স্থানীয় সূত্র বলছে, সরকারি ট্যাফনাল ব্যারেট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিআরডিবি চত্বর পর্যন্ত এলাকায় প্রায় দেড় হাজার ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। একই চিত্র কাপড়িয়া পট্টি, জনতা রোড, থানা রোড ও উপজেলা রোডেও।
চরফ্যাশন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানায়, বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার সময় ফুটপাত ব্যবহার করার সুযোগ নেই। ব্যবসায়ীদের মালামালে পথ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে যানবাহনের সঙ্গে একই সড়ক ব্যবহার করতে হয়।
স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক বলেন, স্কুলগামী শিশুদের নিরাপদ চলাচলের জন্য ফুটপাত তৈরি করা হলেও এখন সেগুলো ব্যবসায়ীদের দখলে। প্রশাসন নিয়মিত ব্যবস্থা না নেওয়ায় সমস্যা দিন দিন স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, 'ফুটপাত ও সড়ক দখল করে ব্যবসা করা অনেকেই স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস খুব কম মানুষের আছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই এসব অনিয়ম বছরের পর বছর টিকে আছে।'
নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রের দাবি, কিছু রাজনৈতিক নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আশ্রয়ে ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন। ফলে প্রশাসনের অভিযানও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হচ্ছে না।
চরফ্যাশনে ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ যে নতুন নয়, তার প্রমাণ মিলেছে পুরোনো একটি ঘটনায়। ২০২১ সালের ১২ মে রাতের দিকে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন শহরে অভিযান পরিচালনা করতে গেলে একদল ব্যবসায়ীর হামলার শিকার হন। হামলাকারীরা তাঁর ব্যবহৃত সরকারি গাড়িও ভাঙচুর করে। ওই ঘটনার পর দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ আর দৃশ্যমান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
চরফ্যাশন পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক খায়রুল ইসলাম সোহেল বলেন, 'ভোলা-৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়নের নির্দেশনায় বাজার ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে শহরের শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিকভাবে প্রশাসনকে সহযোগিতা করা হচ্ছে।'
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ বলেন, 'মাননীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ এবং স্থানীয় নেতাদের সহযোগিতায় প্রধান সড়ক থেকে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের সরানো সম্ভব হয়েছে। শহরের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্বেচ্ছাসেবকেরা কাজ করছেন। ফুটপাত দখলমুক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।'
তবে সরেজমিনে দেখা চিত্র বলছে, প্রধান সড়কের কিছু অংশে পরিবর্তন এলেও পৌর শহরের অধিকাংশ ফুটপাত এখনো ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে নাগরিকদের প্রশ্ন—ফুটপাত কি পথচারীদের জন্য, নাকি প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের স্থায়ী বাণিজ্যকেন্দ্র?