বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
Natun Kagoj

ইসলামের পঞ্চম ঐতিহাসিক মসুলের উমাইয়া মসজিদের ইতিহাস

ইসলামের পঞ্চম ঐতিহাসিক মসুলের উমাইয়া মসজিদের ইতিহাস
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ইরাকের উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন শহর মসুল শুধু সভ্যতা ও সংস্কৃতির জন্যই নয়, ইসলামের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের সাক্ষী। এখানেই অবস্থিত উমাইয়া মসজিদ, যাকে অনেক ইতিহাসবিদ ইসলামের পঞ্চম প্রাচীন মসজিদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রায় ১৪ শতকের দীর্ঘ ইতিহাসে বহুবার যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ, পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে টিকে আছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম বাহিনী যখন নতুন নতুন অঞ্চলে ইসলামের পতাকা প্রতিষ্ঠা করছিল, তখন মসুলও মুসলিম শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময়ের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, নতুন বিজিত অঞ্চলে সর্বপ্রথম একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করা হতো। মসুলে সেই প্রথম জামে মসজিদই পরবর্তীকালে উমাইয়া মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে।

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৬ হিজরি (৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ) সালে মুসলিম সেনানায়ক উকবা ইবন ফারকাদ আল-সুলামি মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের পাশেই গড়ে তোলা হয় প্রশাসনিক কেন্দ্র বা দারুল ইমারাহ। এটি দজলা নদীর তীরবর্তী প্রাচীন মসুলের আল-কালায়াত এলাকায়, বিখ্যাত বাশতাবিয়া দুর্গের কাছাকাছি অবস্থিত।

পরবর্তীতে খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর সময় মসুলের গভর্নর হাইসাম ইবন আরাফাজা আল-বারিকি মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন। একই সঙ্গে এর আশপাশে আবাসিক এলাকা ও বাজার গড়ে ওঠে, যা মসুলকে একটি সুসংগঠিত নগরীতে পরিণত করে।

উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে সম্প্রসারণ

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দ্বিতীয় হিজরি শতকের শুরুতে উমাইয়া শাসক মারওয়ান ইবন মুহাম্মদ পুরোনো স্থাপনা ভেঙে বৃহৎ পরিসরে নতুন করে মসজিদ নির্মাণ করেন। এরপর থেকেই এটি ‘উমাইয়া মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়। তখন এর ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ১১ হাজার মুসল্লি।

পরবর্তীতে ১৬৭ হিজরিতে আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদি আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। এর ফলে প্রায় ২০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায়ের সুযোগ পান।

অবহেলা, পুনর্জাগরণ ও নতুন পরিচয়

চতুর্থ হিজরি শতকে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মসজিদটি ধীরে ধীরে অবহেলিত ও আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পরে আতাবেগীয় শাসনামলে, ১১৪৮ খ্রিস্টাব্দে সাইফ উদ্দিন প্রথমের উদ্যোগে এর বড় ধরনের সংস্কার করা হয়।

আতাবেগীয়রা নতুন আল-নূরি মসজিদ নির্মাণের পর প্রাচীন এই মসজিদকে আলাদা পরিচয় দিতে ‘আল-আতিক’ বা ‘প্রাচীন মসজিদ’ নামে উল্লেখ করতে শুরু করেন।

মঙ্গোল ও তৈমুরের ধ্বংসযজ্ঞ

১২৬১ সালে হালাকু খানের মঙ্গোল বাহিনী মসুল দখলের পর উমাইয়া মসজিদ ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়। এরপর ১৩৯৫ ও ১৪০১ সালে তৈমুর লংয়ের আক্রমণেও মসজিদটি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, এসব হামলায় ইসলামের অন্যতম প্রাচীন এই স্থাপনার অস্তিত্ব মুছে ফেলারই চেষ্টা করা হয়েছিল।

উসমানীয় আমলে পুনর্নির্মাণ

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে উসমানীয় শাসনামলে স্থানীয় মুসলমানরা আবারও এলাকাটি পুনর্বাসন করেন। পরে ১৮১০ সালে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মুসাফফি আল-জাহাব নিজ অর্থায়নে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন। এরপর থেকেই এটি ‘মুসাফফি মসজিদ’ নামেও পরিচিতি লাভ করে। স্থানীয় জিপসাম, পাথর ও ঐতিহ্যবাহী মসুলীয় স্থাপত্যশৈলীতে নতুন রূপ দেওয়া হয় মসজিদটিকে।

আইএস যুদ্ধের ক্ষত এখনও রয়ে গেছে

১৯১৭ সালে একবার বড় ধরনের সংস্কারের পর সর্বশেষ ২০১৭ সালে আইএসবিরোধী সামরিক অভিযানের সময় আবারও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঐতিহাসিক এই মসজিদ। যুদ্ধ শেষে কয়েক বছর পার হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ পুনর্নির্মাণ শুরু হয়নি।

মসুলের সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের পরিচালক আবু বকর কানআন জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত অর্থের অভাব এবং যুদ্ধের সময় অবিস্ফোরিত মাইন ও গোলাবারুদের ঝুঁকির কারণে পুনর্নির্মাণ বিলম্বিত হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় তহবিল পাওয়া গেলে ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখেই মসজিদটি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দামেস্ক বা আলেপ্পোর উমাইয়া মসজিদের মতো বিশ্বব্যাপী পরিচিতি না পেলেও মসুলের এই প্রাচীন মসজিদ ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এবং মুসলিম ঐতিহ্যের মূল্যবান অংশ।


সূত্র: আল জাজিরা
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন