আন্তর্জাতিক চা দিবস: এক কাপ চায়ে সুখের গল্প

এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিলেই যেন মুহূর্তেই দূর হয়ে যায় ক্লান্তি। জীবনের নানা ব্যস্ততা, দুঃখ-সুখ আর আড্ডার প্রতিটি পরত জুড়ে আছে চায়ের অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতি। সকালের অলসতা কাটানো থেকে শুরু করে বিকেলের জমজমাট আড্ডা—চা যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অদৃশ্য সঙ্গী। আজ ২১ মে, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক চা দিবস।
চায়ের ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব ২৭২৭ অব্দে চীনের সম্রাট শেন নুংয়ের রাজপ্রাসাদে একদিন ফুটন্ত পানির পাত্রে বাতাসে উড়ে আসা কিছু বুনো পাতার অংশ পড়ে যায়। সেই পানি পান করার পর সম্রাট এক ভিন্ন স্বাদ ও সতেজতার অনুভূতি পান—যেখান থেকেই চায়ের যাত্রা শুরু বলে ধরা হয়।
শুরুর দিকে চা মূলত ঔষধি ভেষজ পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে ধীরে ধীরে এটি রাজকীয় পানীয়ের মর্যাদা পায়। ১৬ শতকে পর্তুগিজ বণিকদের মাধ্যমে চা এশিয়া থেকে ইউরোপে পৌঁছে যায় এবং ১৭ শতকে ব্রিটিশদের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
জাতিসংঘ ২০১৯ সালে ২১ মে-কে আন্তর্জাতিক চা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও চা বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিবসটি উপলক্ষে কর্মসূচি পালন করে থাকে।
তবে আন্তর্জাতিক চা দিবস শুধু চা পানের আনন্দ উদযাপন নয়—এর পেছনে রয়েছে শ্রমিক অধিকার ও ন্যায্যতার দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। ২০০৪ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরামে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়ার মতো চা উৎপাদনকারী দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলো চা শ্রমিকদের দুরবস্থা ও করপোরেট শোষণের বিষয়টি সামনে আনে।
বিশ্ববাজারে চায়ের দরপতনের কারণে অনেক কোম্পানি চা বাগান বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাই এবং মজুরি কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার দাবিতে একটি আন্তর্জাতিক সচেতনতা দিবসের প্রস্তাব ওঠে।
পরবর্তীতে ২০০৫ সালে দিল্লির এক সম্মেলনে চা উৎপাদনকারী দেশগুলোর অংশগ্রহণে ১৫ ডিসেম্বরকে অনানুষ্ঠানিকভাবে চা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ঐতিহাসিক ‘বোস্টন টি পার্টি’র মতো ঘটনাও, যেখানে ১৭৭৩ সালে ব্রিটিশ করনীতির প্রতিবাদে চায়ের চালান সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘ ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ২১ মে-কে আন্তর্জাতিক চা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যা ২০২০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। মে মাস চা উৎপাদনের নতুন মৌসুম শুরুর সময় হওয়ায় এই তারিখটি প্রতীকী গুরুত্বও বহন করে।
বিশ্বে পানির পর সবচেয়ে বেশি পান করা পানীয় হলো চা। এটি শুধু পানীয় নয়, বরং বহু দেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে চা চাষনির্ভর গ্রামীণ জীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। লাখো কৃষক ও শ্রমিক, যাদের বড় অংশই নারী, এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে চা উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। তাই চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং চা শিল্প টিকিয়ে রাখতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।