কর্মক্ষেত্র থেকে গড়ে উঠছে পরকীয়ার সম্পর্ক

আধুনিক শহুরে জীবনে কর্মক্ষেত্র বা অফিস এখন কেবলই জীবিকা অর্জনের স্থান নয়; বরং এটি অনেকের জন্য গভীর মানসিক ও আবেগীয় সংযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। দিনের সিংহভাগ সময়—প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বা তারও বেশি—কাটছে সহকর্মীদের সাথে। একসঙ্গে প্রজেক্টের চাপ সামলানো, ডেডলাইনের লড়াই, দুপুরের লাঞ্চ ব্রেক, লেট নাইট ডিউটি কিংবা একই ধরণের পেশাদারী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে বহু সম্পর্ক পেশাদারী সীমানা পেরিয়ে রূপ নিচ্ছে ‘ইমোশনাল রিলেশনশিপ’ বা আবেগীয় সম্পর্কে। সমাজবিজ্ঞানী ও সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা একে দেখছেন শহুরে পারিবারিক ভাঙনের অন্যতম অন্তরাল হিসেবে।
আন্তর্জাতিক গবেষণার চমকপ্রদ তথ্য
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্র বিষয়ক গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছেন যে তারা কোনো না কোনো সম্পর্কে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে কোনো সহকর্মীর সঙ্গে আবেগীয় বা রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এছাড়া ৫০ শতাংশ কর্মী কর্মক্ষেত্রে ফ্লার্ট বা হালকা রোমান্টিক আচরণ করার কথা জানিয়েছেন। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ করার ফলে প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে সহকর্মীর প্রতি এক ধরণের স্বস্তি , বিশ্বাস ও মানসিক নিরাপত্তা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে তীব্র আকর্ষণে রূপ নেয়।
কেন অফিসে বাড়ছে পরকীয়া?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কর্মক্ষেত্রে এই ধরণের সম্পর্কের পেছনে প্রধানত কয়েকটি অনুঘটক কাজ করে:
-
মানসিক একাকীত্ব ও পারিবারিক দূরত্ব: দাম্পত্য জীবনে বোঝাপড়ার অভাব বা একঘেয়েমি।
-
দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও দৈনিক সাপোর্ট: দিনের ব্যস্ততম সময়ে যখন পার্টনার দূরে থাকেন, তখন পাশে থাকা সহকর্মীই হয়ে ওঠেন দৈনিক মানসিক সমর্থনের উৎস।
-
শেয়ার্ড স্ট্রেস: একই ধরণের কাজের চাপ ভাগ করে নেওয়ার ফলে "সে আমাকে বোঝে"—এই ধারণাটি প্রবল হয়ে ওঠে।
-
গোপন যোগাযোগ: অফিসের অভ্যন্তরীণ চ্যাট বা কাজের অজুহাতে অতিরিক্ত কথা বলার সুযোগ।
বন্ধুত্বের আড়ালে ‘ইমোশনাল ইনফাইডেলিটি’
সম্পর্ক কাউন্সেলরদের মতে, বাংলাদেশে বড় কোনো সরকারি জরিপ না থাকলেও বর্তমানে বিবাহবিচ্ছেদ এবং পারিবারিক কলহ নিয়ে আসা কেসগুলোর একটি বড় অংশের পেছনে রয়েছে কর্মক্ষেত্রের এই গোপন সম্পর্ক। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই ধরণের বেশিরভাগ সম্পর্কের সূত্রপাত হয় অত্যন্ত নির্দোষভাবে—"আমরা শুধু ভালো বন্ধু" এই বাক্যটি দিয়ে।
পরবর্তীতে এটি রূপ নেয় অতিরিক্ত যত্ন , গভীর রাতে চ্যাটিং, পার্টনারের চেয়ে সহকর্মীকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া এবং মানসিক নির্ভরশীলতায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “ইমোশনাল ইনফাইডেলিটি” বা আবেগীয় পরকীয়া। এখানে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হওয়ার আগেই সঙ্গীর প্রতি মানসিক আনুগত্য বা সততা ভেঙে যায়।
কর্মক্ষেত্র ও ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব
গবেষণা বলছে, এই ধরণের গোপন সম্পর্কের প্রভাব শুধু পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কর্মক্ষেত্রেও:
-
কাজের ক্ষতি: প্রায় ৫৭ শতাংশ মানুষের কাজের পারফরম্যান্স অফিস সম্পর্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
-
অফিস গসিপ ও ঈর্ষা: ৫২ শতাংশ ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে পরচর্চা, পরনিন্দা এবং সহকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক ঈর্ষা বেড়ে যায়।
-
চাকরির ঝুঁকি: প্রায় ৩৫ শতাংশ কর্মী চাকরি হারানোর ভয় এবং নিজের সুনামের কথা চিন্তা করে এই সম্পর্ক অফিসে সম্পূর্ণ গোপন রাখেন।