ঘরের কাজে সহায়তা কমাতে পারে স্ট্রেস ও উদ্বেগ

স্ত্রীকে ঘরের কাজে সাহায্য করা কেবলই একটি নৈতিক দায়িত্ব বা সামাজিক সৌজন্যের বিষয় নয়; আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি পুরুষদের দীর্ঘায়ু ও সুস্থ থাকার এক অনন্য চাবিকাঠি। সাম্প্রতিক বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ও কার্ডিওভাসকুলার গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পুরুষ ঘরের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, তাদের হৃদরোগ (Heart Attack) এবং স্ট্রোকের (Stroke) ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। পারিবারিক কাজে এই অংশগ্রহণ পুরুষদের শরীর ও মস্তিষ্কে এমন কিছু ইতিবাচক হরমোন নিঃসরণ করে, যা সরাসরি তাদের দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা নিশ্চিত করে।
স্ট্রেস হ্রাস ও নিউরোকেমিক্যাল ভারসাম্য
মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রের ক্লান্তি ও দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ (Stress) হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। স্বামী যখন ঘরের কাজে স্ত্রীকে সহযোগিতা করেন, তখন দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে একটি গভীর সমতা ও আবেগগত নিরাপত্তা তৈরি হয়।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল (Harvard Medical School)-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক পারিবারিক সম্পর্ক ও বোঝাপড়া মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ (Prefrontal Cortex)-কে সক্রিয় রাখে, যা মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্ত্রীর পাশে থেকে কাজ করলে শরীরে মানসিক চাপের হরমোন ‘কর্টিসল’ (Cortisol)-এর মাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করে। একই সাথে মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ ও ‘ডোপামিন’-এর মতো সুখের হরমোন উৎপাদিত হয়, যা হৃদযন্ত্রের গতিকে স্থিতিশীল রাখে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
হালকা শারীরিক সক্রিয়তা ও কার্ডিওভাসকুলার উন্নতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর বিভিন্ন স্বাস্থ্য নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, অলস বা নিষ্ক্রিয় জীবনধারা (Sedentary Lifestyle) পরিহার করে দৈনন্দিন হালকা শারীরিক কাজ করলেও কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়।
-
রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি: ঘর গোছানো, বাজার করা বা রান্নায় সাহায্য করার মতো কাজগুলো শরীরের পেশিকে সচল রাখে।
-
ব্রেনে অক্সিজেন প্রবাহ: এই হালকা শারীরিক সক্রিয়তার ফলে শরীরে রক্তসঞ্চালন বাড়ে, যা মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে। এর ফলে পুরুষদের মনোযোগ, কার্যক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত হয়।
ডিপ্রেশন ও উদ্বেগ থেকে মুক্তি
মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, পারিবারিক কাজে অংশগ্রহণ পুরুষদের মধ্যে এক ধরণের আত্মতৃপ্তি ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি বৃদ্ধি করে। এটি পুরুষদের একাকীত্ব, ডিপ্রেশন (Depression) ও তীব্র উদ্বেগ বা এনজাইটি কমাতে সাহায্য করে। সামাজিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যেসব পুরুষ পরিবারে বেশি সময় ও শ্রম দেন, তারা মানসিকভাবে বেশি স্থিতিশীল, সুখী এবং তুলনামূলকভাবে দীর্ঘায়ু হন।
আধুনিক করপোরেট ও ব্যস্ত জীবনযাত্রায় যেখানে হৃদরোগ এবং মানসিক অবসাদ মহামারী আকার ধারণ করছে, সেখানে পারিবারিক সহযোগিতা একটি সহজ, প্রাকৃতিক অথচ অত্যন্ত কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। চিকিৎসকদের মতে, ঘরের কাজকে কোনো ‘বাধ্যবাধকতা’ না ভেবে একে একটি স্বাস্থ্যবর্ধক জীবনধারা (Healthy Lifestyle) হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এর মাধ্যমে যেমন পরিবারে সুখ ও শান্তি বজায় থাকে, তেমনি ব্যক্তি নিজেও দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবন উপভোগ করতে পারেন।