রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • মার্কিন বিনিয়োগ বাড়াতে ৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য: বাণিজ্যমন্ত্রী আ. লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বৈধতা চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তের ওপারে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি যুবক নিহত সাতকানিয়ার ৬ ইউনিয়ন নিয়ে নতুন উপজেলা গঠনের উদ্যোগ সাবালেঙ্কাকে হারিয়ে ইউএস ওপেন জিতে বিশ্বসেরা রিবাকিনা প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ভোটে সম্মতি ও নতুন নিবন্ধনের আহ্বান নৃত্য পরিবেশনের কথা বলে নদীর মাঝখানে নিয়ে দুই শিল্পীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ডিএমপির অভিযানে গ্রেপ্তার ৬২৯, উদ্ধার অস্ত্র-মাদক জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের আইনি বৈধতা নেই: হাইকোর্ট ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রচারপত্র বিতরণ করবে বিএনপি
  • অনুমানভিত্তিক সিদ্ধান্তে ক্ষতির মুখে ইলিশ ব্যবসায়ীরা

    অনুমানভিত্তিক সিদ্ধান্তে ক্ষতির মুখে ইলিশ ব্যবসায়ীরা
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    গত মঙ্গলবার (১২ মে) দিবাগত রাত ১০টা। ভোলা সদর উপজেলার পানপট্টি বাজার সংলগ্ন এলাকায় তিনটি ট্রাক ঘিরে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলছিল। একপক্ষে কোস্ট গার্ড ও মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা, অন্যপক্ষে ট্রাকের চালক ও মাছ ব্যবসায়ীরা। যৌথ বাহিনীর দাবি—ট্রাকগুলোতে থাকা ১০ হাজার ১৪০ কেজি ইলিশ নিষিদ্ধ সময়ে সাগর থেকে ধরা। আর ব্যবসায়ীদের দাবি—এগুলো নদীর মাছ, যার বৈধ কাগজপত্র তাদের হাতেই রয়েছে। 

    শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের দাবি টেকেনি। ১ কোটি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা মূল্যের এই বিশাল মাছের চালান জব্দ করে রাতেই বিলিয়ে দেওয়া হয় স্থানীয় এতিমখানা ও দুস্থদের মাঝে। কিন্তু মাছ বিলিয়ে দেওয়ার পর শুরু হয়েছে আসল বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে, জব্দ হওয়া মাছ কি আসলেই সাগরের ছিল, নাকি নদীর বৈধ মাছ সাগরের তকমা দিয়ে জব্দ করা হলো? 

    সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, গত ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। তবে দেশের নদ-নদীতে ইলিশ আহরণে এই মুহূর্তে কোনো বাধা নেই। ব্যবসায়ীরা মৎস্য বিভাগ থেকে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট 'অনুমতিপত্র' দেখিয়ে দাবি করছেন, এই ইলিশগুলো মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর। 

    নাম প্রকাশ না করা শর্তে নতুন স্লুইস মৎস্যঘাটের একজন ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'আমাদের কাছে মৎস্য অফিসের দেওয়া ক্লিয়ারেন্স আছে। নদী থেকে মাছ ধরে আমরা দেশের অন্য প্রান্তে পাঠাচ্ছিলাম। কিন্তু কোস্ট গার্ড কোনো কথা না শুনেই আমাদের মাছগুলো 'সাগরের' বলে নিয়ে গেল। মৎস্য অফিসের কাগজ কি তবে ভুয়া?' 

    পুরো ঘটনার পরতে পরতে এখন হাজারো প্রশ্ন দানা বেঁধেছে। প্রথমত, সাগরের ইলিশ আর নদীর ইলিশের পার্থক্য করার কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তাৎক্ষণিক অভিযানে ব্যবহার করা হয়নি। কেবল অভিজ্ঞতালব্ধ অনুমান বা ‘সন্দেহের’ ওপর ভিত্তি করে কোটি টাকার সম্পদ এভাবে বিতরণ করে দেওয়া আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। 

    দ্বিতীয়ত, মৎস্য বিভাগের ভূমিকা এখানে চরম স্ববিরোধী। ব্যবসায়ীদের হাতে যদি মৎস্য বিভাগেরই দেওয়া বৈধ ‘অনুমতিপত্র’ থেকে থাকে, তবে সেই একই বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কীভাবে সেই মাছ জব্দ ও বিতরণ করা হলো? এতে একদিকে সরকারি নথির বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন সংকটে পড়েছে, তেমনি প্রশ্ন উঠেছে বিভাগীয় সমন্বয়হীনতা নিয়ে। 

    সবচেয়ে বড় সংশয় তৈরি হয়েছে একটি বিশেষ দিক নিয়ে—ব্যবসায়ীরা কি নদীর কাগজকে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে সাগরের নিষিদ্ধ মাছ পাচার করছিলেন, নাকি মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের অতি-তৎপরতায় বৈধ ব্যবসায়ীরা বলির পাঁঠা হলেন? যদি কাগজ সঠিক হয়ে থাকে, তবে কেন তা গ্রাহ্য করা হলো না? আর যদি কাগজ ভুয়া বা জালিয়াতির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে, তবে সেই উৎস শনাক্ত না করে তড়িঘড়ি মাছ বিতরণ কেন শেষ সমাধান হবে? এই অস্পষ্টতা অভিযানকে কেবল একটি সংখ্যাগত সাফল্য হিসেবে দেখাচ্ছে, কিন্তু আইনি ও পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলো আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। 

    কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছেন এগুলো সাগরের মাছ। সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সরকার যে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে তারা বদ্ধপরিকর। জব্দকৃত মাছ সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই বিতরণ করা হয়েছে। 

    তবে ভোলা সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মৎস্য কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ভূঁইয়ার উপস্থিতিতে মাছ বিতরণ হলেও ব্যবসায়ীদের হাতে থাকা 'অনুমতিপত্র' নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি। 

    অনুমতিপত্র থাকার পরও মাছ কেন জব্দ হলো—এমন প্রশ্নে চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, 'মাছগুলো যে নদী থেকে আহরিত, তার সত্যতা যাচাই করেই আমি অনুমতিপত্র দিয়েছি। তবে ভোলা সদরে অভিযানটি যখন চলে, তখন আমি সেখানে ছিলাম না। আমার দেওয়া সরকারি কাগজের কেন মূল্যায়ন হলো না, সেটা বড় প্রশ্ন।' 

    সাগর ও নদীর মাছের এই 'আইনি চোর-পুলিশ খেলা'য় ভোলার মাছ বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, যদি বৈধ কাগজ থাকার পরও মাছ জব্দ হয়, তবে তারা ব্যবসা করবেন কীভাবে? অন্যদিকে মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযান চলাকালীন মাছের উৎস নিশ্চিত করার জন্য বিশেষজ্ঞ দল এবং ল্যাবরেটরি টেস্টের সুযোগ থাকা প্রয়োজন, অন্যথায় এমন বিতর্ক সরকারি পদক্ষেপের উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। 

    ভোলার এই ঘটনা এখন কেবল মাছ জব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন পদ্ধতিগত স্বচ্ছতার এক বড় পরীক্ষা। জব্দ হওয়া মাছ পেটে গেছে দুস্থদের, কিন্তু কোটি টাকার লোকসানে পড়া ব্যবসায়ীদের দাবি আর প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার পাহাড়—এই দুইয়ের মাঝে চাপা পড়ে গেছে প্রকৃত সত্য। 


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ