হান্টাভাইরাস কি নতুন মহামারির ইঙ্গিত দিচ্ছে?

আটলান্টিক মহাসাগরে ভ্রমণরত একটি বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে জাহাজটির তিন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এছাড়া চিকিৎসার জন্য আরও কয়েকজনকে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের জাহাজটি প্রায় এক মাস আগে আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। জাহাজটিতে ২৮টি দেশের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।
যেভাবে শুরু হয় আতঙ্ক
প্রথমে ১১ এপ্রিল এক ডাচ নাগরিক জাহাজে মারা যান। পরে তার স্ত্রীকেও গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়া হলে তিনি মারা যান। পরীক্ষায় তার শরীরে হান্টাভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর আরও এক জার্মান যাত্রীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, জাহাজটিতে ভাইরাসটির অ্যান্ডিস স্ট্রেইন শনাক্ত হয়েছে, যা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে সক্ষম।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখন যাত্রীদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে কাজ করছে। কারণ যাত্রীরা বিভিন্ন দেশে বিমানে ভ্রমণ করেছেন।
হান্টাভাইরাস কী?
হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ইঁদুরের মল, প্রস্রাব বা লালা শুকিয়ে বাতাসে মিশে গেলে শ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ভাইরাসটি প্রবেশ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাইরাস দুই ধরনের জটিল রোগ সৃষ্টি করতে পারে—
হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (HPS)
হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (HFRS)
প্রথমটিতে জ্বর, পেশিতে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের জটিলতা দেখা দেয়। অন্যদিকে দ্বিতীয়টি কিডনির মারাত্মক ক্ষতি ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণ হতে পারে।
কতটা ঝুঁকি রয়েছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এটি কোভিড-১৯ এর মতো পরিস্থিতি নয় এবং সাধারণ মানুষের জন্য সামগ্রিক ঝুঁকি কম। কারণ ভাইরাসটি সহজে বাতাসে ছড়ায় না; সাধারণত ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমেই সংক্রমণ ঘটে।
ডব্লিউএইচওর সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভ্যান কেরখোভে বলেন, “এটি ইনফ্লুয়েঞ্জা বা করোনা ভাইরাসের মতো নয়। সংক্রমণের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন।”
তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে জাহাজে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বিশেষ সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
হান্টাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা এখনো নেই। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী অক্সিজেন থেরাপি, আইসিইউ সাপোর্ট, ভেন্টিলেশন ও অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ, বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখা এবং ইঁদুরের মল পরিষ্কারের সময় মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ভাইরাসটির ইনকিউবেশন সময় ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে সামনে আরও সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।