রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুই নারী নেতা— শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার ভার মূলত এই দুই নেত্রীর হাতেই ছিল। কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই ধারাবাহিকতায় একটি ঐতিহাসিক বিরতি টানতে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা এবং শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি— একদিকে যেমন ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিয়েছে, অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু একটি রাজনৈতিক যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটিয়েছে। ফলে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর বাংলাদেশ এমন এক নির্বাচনের মুখোমুখি, যেখানে শীর্ষ নেতৃত্বে কোনো নারী নেই। নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য সবাই পুরুষ— যা দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন।
১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে বাংলাদেশ প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী পায়। এরপর শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার পালাবদলে আবর্তিত হয়েছে জাতীয় রাজনীতি। এই সময়কে অনেকেই ‘দুই নেত্রীর রাজনীতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ইতিবাচক দিক থেকে দেখলে, এ সময় নারী নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে নারী ক্ষমতায়নের এক অনন্য উদাহরণ ছিল বাংলাদেশ।
তবে এ সময়ের রাজনীতি ছিল তীব্র মেরুকরণ, অবিশ্বাস এবং সংঘাতেরও ইতিহাস। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক, আন্দোলন-সংঘাত, বয়কট ও সহিংসতা— সব মিলিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা সমালোচনা হয়েছে, যা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপির নেতৃত্বে তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট— উভয় ক্ষেত্রেই পুরুষ নেতৃত্বের উপস্থিতি স্পষ্ট। অর্থাৎ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু এখন আর দুই নেত্রী নন; বরং নতুন প্রজন্ম ও নতুন নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তন কেবল ব্যক্তির নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও। দীর্ঘদিনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দলীয় গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো— নতুন নেতৃত্ব কি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে? নাকি পুরোনো দ্বন্দ্ব ও বিভাজনের নতুন সংস্করণই আমরা দেখতে পাব?
বাংলাদেশের ইতিহাসে নেতৃত্বের পরিবর্তন সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দিয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান, এরশাদ আমল থেকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা— প্রতিটি সময় ছিল পরিবর্তনের সূচনা। এখন আবার এক নতুন সন্ধিক্ষণ।
দুই নেত্রীর যুগের অবসান নিঃসন্দেহে আবেগ, স্মৃতি ও রাজনৈতিক মূল্যায়নের বিষয়। কিন্তু গণতন্ত্রের মূল শক্তি ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান। তাই আসন্ন নির্বাচন কেবল একজন নতুন প্রধানমন্ত্রীর অভিষেক নয়; এটি হতে পারে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ।
বাংলাদেশ কি সেই সুযোগ গ্রহণ করবে? উত্তর লুকিয়ে আছে জনগণের রায়ে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রজ্ঞায়।