বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
Natun Kagoj

জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার মূল্য দিচ্ছে জনগণ

জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার মূল্য দিচ্ছে জনগণ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

শীতের শুরুতেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে গ্যাস সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে, তা আর সাময়িক ভোগান্তির পর্যায়ে নেই—এটি স্পষ্টতই জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার নগ্ন প্রকাশ। মাসের পর মাস নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও গ্রাহকরা যখন রান্নার ন্যূনতম গ্যাস পান না, তখন সেই ব্যবস্থাকে কার্যকর ও জনবান্ধব বলা যায় না। এর ওপর এলপিজির তীব্র সংকট ও লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে দ্বিমুখী সংকটে ঠেলে দিয়েছে।

বাসাবাড়িতে সরকারি পাইপলাইন গ্যাস কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় দিনের পর দিন গ্যাস থাকে না, থাকলেও তা মাঝরাতে সামান্য সময়ের জন্য। অথচ নির্ধারিত বিল দিতে কোনো ছাড় নেই। এটি এক ধরনের আর্থিক অবিচার। অন্যদিকে, বিকল্প হিসেবে যাকে সামনে আনা হচ্ছে—এলপিজি—সেটিও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে, এখানে নিয়ন্ত্রণের অভাব কতটা প্রকট।

এলপিজি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক সরবরাহ বিঘ্ন, এলসি জটিলতা, আমদানি হ্রাস—এসব কারণ থাকলেও প্রশ্ন থেকেই যায়: সরকার ও নীতিনির্ধারকরা কি এই সংকটের পূর্বাভাস পাননি? শীত মৌসুমে গ্যাসের চাহিদা বাড়বে, পাইপলাইনে চাপ কমবে—এটি নতুন কিছু নয়। তবুও আগাম প্রস্তুতি ও পর্যাপ্ত মজুত না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

সরকারি তথ্যেই স্পষ্ট, দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। দেশীয় কূপ থেকে উৎপাদন কমছে, এলএনজি আমদানির সক্ষমতাও সীমিত। এই বাস্তবতায় আবাসিক খাতে পাইপলাইন গ্যাসের ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চিত, তা এখন আর অনুমানের বিষয় নয়। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও ইঙ্গিত দেয়—পাইপলাইন গ্যাসের ঘাটতি আসলে ভবিষ্যৎ সংকটের ‘সিগন্যাল’।

এই অবস্থায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়লেও কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্তের অভাব। বহুতল ভবনে মাটির চুলা ব্যবহার সম্ভব নয়, ইলেকট্রিক বা ইন্ডাকশন চুলার দিকে ঝুঁকতে গিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের ওপর চাপ এবং অতিরিক্ত খরচ। অর্থাৎ, সংকট এক খাত থেকে আরেক খাতে সরে গিয়ে ভোগান্তির চক্র তৈরি করছে।

সমাধান একদিনে আসবে না—এটি সত্য। কিন্তু সংকট স্বীকার করে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা জরুরি। আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহের ভবিষ্যৎ কী, এলপিজিকে কীভাবে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা হবে, অবৈধ সংযোগ বন্ধে কী ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের জবাব জনগণ এখনই জানতে চায়।

জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, এটি জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিল দিয়েও গ্যাস না পাওয়ার যে অভিজ্ঞতা মানুষ পাচ্ছে, তা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাকে দুর্বল করে। এই সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন দায় এড়ানোর সংস্কৃতি পরিহার করে বাস্তবভিত্তিক, দীর্ঘমেয়াদি ও জনগণকেন্দ্রিক জ্বালানি নীতি। অন্যথায়, শীত পেরোলেও গ্যাস সংকট আর জনভোগান্তি থেকে যাবে—আর তার মূল্য দিতে থাকবে সাধারণ মানুষই।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন