বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
Natun Kagoj

নির্বাচনি কৌশল বনাম আদর্শ: এনসিপিতে ভাঙনের ঝড় ও তৃণমূলের অসন্তোষ

নির্বাচনি কৌশল বনাম আদর্শ: এনসিপিতে ভাঙনের ঝড় ও তৃণমূলের অসন্তোষ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি ইসলামি দলের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই পদক্ষেপ দলের তৃণমূল স্তরে বিশৃঙ্খলা ও অসন্তোষের সূত্রপাত করেছে। দেখা দিয়েছে আদর্শ বনাম কৌশল নিয়ে বিতর্ক, যা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে ইতিমধ্যেই অন্তত ১৫ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগকারীদের একাংশের মত, নির্বাচনের সময় এনসিপি দেশের মানুষের কাছে পরিচিতি ও নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার সুযোগ হিসেবে নিজেদের মধ্যমপন্থি অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারত। অন্যদিকে তৃণমূলের নেতারা মনে করছেন, দল ক্রমশ ডানপন্থি কৌশল অবলম্বন করছে, যা প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

দলীয় সূত্র জানাচ্ছে, জোট গঠনের বিষয়ে তৃণমূল বা মধ্যম সারির নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাই হয়নি। শীর্ষ নেতৃত্ব একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে দলের গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। পদত্যাগকারীরা অভিযোগ করেছেন, ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা এনসিপির মধ্যমপন্থি ভোটভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই সমঝোতাকে বাস্তববাদী রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর ঐক্য ছাড়া নির্বাচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব নয়। জোট মানেই আদর্শ বিসর্জন নয়—এনসিপি এখনও মধ্যমপন্থি রাজনীতিতেই বিশ্বাসী।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, কে দলে থাকবে বা পদত্যাগ করবে তা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। দলের মধ্যে কিছু টেনশন স্বাভাবিক। তবে দল রাজনৈতিকভাবে অটুট। আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও মধ্যমপন্থার রাজনীতি অব্যাহত থাকবে।

পদত্যাগকারীদের মধ্যে রয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা, যুগ্ম সদস্য সচিব মীর আরশাদুল হক, যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, এবং আরও অন্তত ১২ জন। তারা অভিযোগ করেছেন, জোটের কারণে দলের আদর্শ ও স্থির ভোটভিত্তি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন জানিয়েছেন, পদত্যাগ সত্ত্বেও দলীয়ভাবে কোনো সংকট নেই। তবে জোটের কারণে তৃণমূল স্তরে নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। খুলনা বিভাগের যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হক বলেন, ডানপন্থি জোটে যুক্ত হওয়ায় দলের মধ্যমপন্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নতুন সংগঠন হওয়ায় নেতাকর্মীদের দ্রুত লয়াল করা সম্ভব হয়নি, যা নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনসিপির এই সমঝোতা স্বল্পমেয়াদে নির্বাচনে সুবিধা দিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দলের আদর্শিক পরিচয় ও তরুণ ভোটারদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভোটের আগে তৈরি এই অস্থিরতা আগামী নির্বাচনে দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং ভোটপ্রভাবের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের সাফল্যের জন্য যে কৌশল গ্রহণ করা হলো, তা কি আদর্শের সঙ্গে সংঘাতের মূল্যে গ্রহণযোগ্য হবে, নাকি এই পদক্ষেপ এনসিপির জন্য দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে? রাজনৈতিক অঙ্গন এখন সেই দ্বন্দ্বের ফলাফলের দিকে নজর রাখছে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন