মেঘনার পানি আনতে ওয়াসার এক যুগ

ঢাকাবাসীর পানির কষ্ট দূর করতে বড় উদ্যোগ নিয়েছিলো ঢাকা ওয়াসা। কথা ছিল পানি আনা হবে মেঘনা নদী থেকে। মিটবে নগরবাসীর তৃষ্ণৃা। তবে সে পানি আনতে অপেক্ষা করতে হলো ১২ বছর। তবে সেই পানি ঢাকায় এখনো আসেনি। উল্টো প্রকল্পের খরচ বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি।
তথ্য বলছে, প্রকল্পটি পাস হয় ২০১৩ সালে। শুরুতে খরচ ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। কথা ছিল ২০১৯ সালের মধ্যে কাজ শেষ হবে। জমি কেনা আর ঠিকাদার নিয়োগ করতেই অনেক সময় চলে যায়। এরপর কাজ শেষ না হওয়ায় বারবার সময় বাড়ানো হয়। সেই সাথে বাড়ানো হয় টাকা। সবশেষ হিসেবে, ৫ হাজার কোটির এই প্রকল্পের খরচ এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকায়। কাজ শেষ করার সময়ও আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে।
তবে, এই বিশাল খরচের বড় অংশই আসছে বিদেশি ঋণ থেকে (প্রায় ৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা)। বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ৪ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। আর ওয়াসা নিজের পকেট থেকে দিচ্ছে মাত্র ২২ কোটি টাকা।
ঢাকা ওয়াসার এই মেগা প্রকল্পটি মূলত ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই (ডিইএসডব্লিউএস)’ প্রকল্প নামে পরিচিত। মেঘনা নদীর পানি এনে শোধন করে ঢাকায় সরবরাহ করাই এর মূল উদ্দেশ্য। ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার (বিশনন্দী) ও রূপগঞ্জ (গন্ধর্বপুর) এলাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এটির লক্ষ্য হচ্ছে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি শোধন করে ঢাকাবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া, যাতে ভূগর্ভস্থ (মাটির নিচের) পানির ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। পুরো কাজটি কয়েকটি ভাগে (প্যাকেজে) চলছে। এর মধ্যে পাইপলাইন নির্মাণের জন্য ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে ওয়াসা।
২০১৩ সালের অক্টোবরে তৎকালীন একনেক সভায় যখন প্রকল্পটি অনুমোদন পায়, তখন এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। লক্ষ্য ছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় সময় বাড়িয়ে ২০২০ সালের ডিসেম্বর করা হয়। ২০২১ সালে মেয়াদ আরও দেড় বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয় এবং বরাদ্দ বাড়ানো হয় ২ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে এসে আরও ৯৫১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা খরচ বাড়িয়ে মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। চারবার মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ শেষ না হওয়ায় এবার তৃতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে আরও ২ হাজার ৮২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। ফলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় এখন দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকায়। কাজ শেষ না হওয়ায় আবারও বাড়ছে এর মেয়াদ।
এই বিশাল ব্যয়ের মধ্যে ৪ হাজার ২১৩ কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে সরকারি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করা হচ্ছে ২২ কোটি টাকা। আর বাকি ৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা ঋণ ও অনুদান হিসেবে দিচ্ছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), এজেন্সি ফ্রঁসেজ ডি ডেভেলপমেন্ট (এএফডি) এবং ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি)।
মেঘনা নদীর পানি শোধন করে ঢাকায় আনার কথা ছিল। লক্ষ্য ছিল প্রতিদিন ৫০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা। এর ফলে ঢাকার মাটির নিচের পানির ওপর চাপ কমবে।
এ বিষয়ে ওয়াসার প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদের সাথে একাধীকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোন করে ম্যাসেজ দেয়া হলেও সময় দিয়েও তিনি কথা বলেননি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার চাইলে প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ করা সম্ভব। এখানে সদিচ্ছার ব্যাপার জড়িত। তবে ১২ বছরেও সুফল না মেলায় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, “কথা ছিল এই প্রকল্পের ফলে মাটির নিচের পানির ওপর চাপ কমবে। কিন্তু ১২ বছরেও আমরা তার কোনো সুফল দেখলাম না। আমাদের এখনো মাটির নিচের পানির ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা মহানগরীর মতিঝিল, পল্টন, ফকিরাপুল, উত্তরা, গুলশান, বনানী, নিকুঞ্জ, খিলক্ষেত, বাড্ডাসহ সমগ্র মিরপুর ও আশপাশ এলাকায় ২৪ ঘণ্টা পানি সরবরাহ কবে নাগাদ নিশ্চিত হবে এ ব্যাপারে দ্রুতই ধোয়াশা না কাটলেও উদ্বেগ বাড়বে নগরবাসীর মধ্যে।