দানবীর না দুর্নীতিবাজ? দুদকের অনুসন্ধানে আব্দুর রাজ্জাক

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রভাব খাটিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ-বিত্ত গড়ে তোলার অভিযোগের অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রায় এক বছর আগে অনুসন্ধান শুরু হলেও এখনো তা শেষ হয়নি। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে কেন তদন্তের অগ্রগতি ধীরগতির।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের শুরুতে কমিশনের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগে বলা হয়, সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৭ মে দুদকের উপপরিচালক নাজমুল হাসান ও উপসহকারী পরিচালক মো. আসাদুজ্জামানের সমন্বয়ে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
দুদক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসীর নামে থাকা স্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ জন্য রাজউকসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রাপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণ শেষে কমিশনে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। এরপর কমিশন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
দুদকের একটি সূত্র জানায়, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য আব্দুর রাজ্জাককে একাধিকবার তলব করা হলেও তিনি হাজির হননি। পরে বিভিন্ন সংস্থার কাছে তার সম্পদসংক্রান্ত তথ্য চেয়ে নতুন করে চিঠি পাঠানো হয়। বর্তমানে সেসব তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার নিজ গ্রামে আব্দুর রাজ্জাক কয়েক একর জমির ওপর দোতলা বাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং মৎস্য খামার প্রতিষ্ঠা করেছেন। এছাড়া স্থানীয় বাজারে বহুতল ভবন, ঢাকা, গাজীপুর ও শেরপুরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বাড়ি ও জমির মালিকানা রয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকায় তার একাধিক বহুতল ভবন রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সাভারের ভাকুর্তায় ‘ওশাকা পাওয়ার লিমিটেড’ নামে একটি সাব-স্টেশন সরঞ্জাম উৎপাদনকারী কারখানার মালিকানার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিদ্যুতের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সংযোগ নিতে আগ্রহী অনেক গ্রাহককে তার প্রতিষ্ঠানের তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার করতে বাধ্য করা হতো। কেউ তা না মানলে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানির মুখে পড়তেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়, ডিপিডিসিতে প্রভাবশালী অবস্থান কাজে লাগিয়ে বদলি, পদোন্নতি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার প্রভাব ছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২ সালে ওশাকা পাওয়ার লিমিটেডের সরবরাহ করা ট্রান্সফরমারের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তদন্তে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ট্রান্সফরমার মানসম্মত নয় বলে উঠে আসে। এরপর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ডিপিডিসির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরও অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পর তার মালিকানাধীন কারখানার কার্যক্রমে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং সেটি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, স্থানীয় এলাকায় আব্দুর রাজ্জাককে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য অনেকেই ‘দানবীর’ হিসেবে চেনেন। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং অসহায় মানুষের সহায়তায় বিভিন্ন সময় অবদান রেখেছেন বলে স্থানীয়দের একাংশ জানিয়েছেন। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, সমাজসেবার আড়ালে অবৈধ সম্পদের উৎস আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফোনে সাড়া না দেওয়ার পাশাপাশি পাঠানো বার্তারও জবাব দেননি তিনি।
উল্লেখ্য, দুদক বিধিমালা অনুযায়ী কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান সাধারণত ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার কথা। বিশেষ ক্ষেত্রে আরও ৩০ কার্যদিবস সময় নেওয়া যায়। কিন্তু এই অনুসন্ধান নির্ধারিত সময়ের অনেক বেশি অতিক্রম করলেও এখনো শেষ হয়নি, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।