মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
Natun Kagoj
দুর্নীতি - অনিয়মের অভিযোগে তদন্তে খাদ্য বিভাগ

খুলনার ওএমএস সেক্টর সিন্ডিকেটের দখলে!

খুলনার ওএমএস সেক্টর সিন্ডিকেটের দখলে!
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও খুলনার খোলা বাজারে স্বল্পমূল্যে চাল-আটা বিক্রির সরকারি কর্মসূচি (ওএমএস) এখনো আওয়ামীপন্থি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নগরীর ৩১ জন ওএমএস ডিলারের মধ্যে অন্তত ২০ জন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী, তাদের পরিবারের সদস্য কিংবা ঘনিষ্ঠজন বলে জানা গেছে। একাধিক ব্যক্তির নামে ও আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে একাধিক লাইসেন্স পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।


অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের প্রভাব সরকারি খাদ্য বিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। খাদ্য বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বরাদ্দকৃত চাল-আটার একটি বড় অংশ কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ফলে সরকারের দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।


জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, খাদ্যপণ্য কালোবাজারে বিক্রি ও লাইসেন্সের প্রকৃত মালিকানার অস্তিত্ব না থাকার অভিযোগে ২০২০ সালের ৫ মে খুলনা জেলা প্রশাসনের গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি পাঁচটি ওএমএস লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করে। লাইসেন্সগুলো হলো— মেসার্স সুলতানা এন্টারপ্রাইজ, এসএম এন্টারপ্রাইজ, রুবেল এন্টারপ্রাইজ, নির্মাণ এন্টারপ্রাইজ ও জোহরা এন্টারপ্রাইজ।


অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইউসুফ আলীর নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ, দুদক খুলনার উপ-পরিচালক নাজমুল হাসান, খুলনা প্রেসক্লাবের প্রতিনিধি সুনীল দাস এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তানভীর আলম সদস্য ছিলেন। তদন্ত প্রতিবেদনে ওএমএস ডিলার সাঈয়েদুজ্জামান মোল্লা সম্রাটের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পাঁচটি লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়।


তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার ও ওএমএস কমিটির সভাপতি মো. মাহাবুবুর রহমান লাইসেন্সগুলো বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, বাতিলের আদেশ কার্যকর না হয়ে অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে ওই লাইসেন্সগুলোর কার্যক্রম আজও বহাল রয়েছে। উচ্চ আদালতের আদেশের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন এক কর্মকর্তার সহযোগিতায় লাইসেন্সগুলো পুনরায় চালু করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।


এদিকে একই অভিযোগে দীর্ঘ ছয় বছর পর আবারও তদন্তে নেমেছে জেলা খাদ্য বিভাগ। গত ১৮ জুন ২০২৬ সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক বনী আমিনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২১ জুন অভিযুক্ত পাঁচ লাইসেন্সধারীকে তদন্ত কমিটির সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এবারও অভিযোগের মুখে থাকা ব্যক্তিরা পার পেয়ে যাবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।


সূত্র জানায়, সরকার নগরীর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকা ও আটা ২৪ টাকায় বিক্রি করছে। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি চাল ও পাঁচ কেজি আটা কিনতে পারেন। খুলনা মহানগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে ৩১ জন ডিলারের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।


খাদ্য বিভাগ সূত্রে আরও জানা যায়, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের আগে খুলনায় ওএমএস ডিলারের সংখ্যা ছিল ৭৩ জন। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল করে লটারির মাধ্যমে নতুন ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে ১২ জন নতুন ডিলার নিয়োগ পেলেও বাকি ১৯ জন উচ্চ আদালতের আদেশে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। অভিযোগ রয়েছে, এই ১৯ জনই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী।


অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক সাঈয়েদুজ্জামান মোল্লা সম্রাট। তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান মেসার্স সুলতানা এন্টারপ্রাইজ ছাড়াও ছোট ভাই এমডি ওয়াহিদুজ্জামানের নামে এসএম এন্টারপ্রাইজ, মামি নিশাত পারভিনের নামে রুবেল স্টোর, আত্মীয় আসাদুজ্জামান শেখের নামে আসাদ স্টোর, জোহরা এন্টারপ্রাইজ ও নির্মাণ এন্টারপ্রাইজ পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সধারীর ভোটার পরিচয়পত্র খুলনার বাইরে হওয়ায় তা বিধিবহির্ভূত বলেও অভিযোগ উঠেছে।


এ বিষয়ে সাঈয়েদুজ্জামান মোল্লা সম্রাট আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও তার নামে একাধিক লাইসেন্স ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক বনী আমিন বলেন, “অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। এর আগে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।”


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন