হাওর-বন বাঁচলে বাঁচবে মৌলভীবাজার

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ হাওর, সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য মৌলভীবাজার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত অঞ্চল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই জেলার প্রাকৃতিক সম্পদ আজ নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে। হাওর ভরাট, অবৈধ বালু উত্তোলন, বনজ সম্পদ চুরি এবং অনুমোদনহীন ইটভাটার দৌরাত্ম্যে জেলার পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
হাকালুকি, হাইল ও কাউয়াদীঘি হাওর শুধু জলাভূমি নয়, এগুলো স্থানীয় অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অথচ অব্যবস্থাপনা, দখলদারিত্ব ও পলি জমার কারণে একের পর এক বিল হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে মাছের উৎপাদন কমছে, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। জলাভূমি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
একইভাবে বনাঞ্চলেও চলছে নির্বিচার লুটপাট। সংরক্ষিত বন থেকে গাছ ও বাঁশ চুরি কেবল বনভূমির আয়তন কমাচ্ছে না, বরং বন্যপ্রাণীর অস্তিত্বকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। বন ধ্বংসের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে বনজ সম্পদ রক্ষায় কঠোর নজরদারি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
অবৈধ ইটভাটাগুলোও পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে ইট উৎপাদন এবং জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়ানোর কারণে একদিকে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বায়ুদূষণ। আইনি বৈধতা না থাকা সত্ত্বেও এসব ইটভাটা বছরের পর বছর চালু থাকা প্রশাসনিক দুর্বলতারই পরিচায়ক।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, তা এখনো যথেষ্ট নয়। প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত অভিযান এবং কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মৌলভীবাজারের হাওর, বন ও ছড়াগুলো কেবল একটি জেলার সম্পদ নয়; এগুলো জাতীয় সম্পদ। তাই পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের উদাসীনতার সুযোগ নেই। হাওর ও বন টিকিয়ে রাখা মানেই জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা করা। এ কারণেই বলতে হয়— হাওর-বন বাঁচলে বাঁচবে মৌলভীবাজার। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।