মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

চিকিৎসক নিরাপত্তাহীনতা: ভাঙছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার আস্থার দেয়াল

চিকিৎসক নিরাপত্তাহীনতা: ভাঙছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার আস্থার দেয়াল
ছবি: এআই
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসক নাসির ইসলামের ওপর কর্মস্থলে হামলার ঘটনা দেশের স্বাস্থ্যখাতে চলমান উদ্বেগকে নতুন করে সামনে এনেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসকদের ওপর একের পর এক হামলা, হুমকি ও সংঘর্ষের ধারাবাহিকতার অংশ, যা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ভেতরে গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গত কয়েক মাসে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসককে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার ঘটনা, পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসককে মারধর, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংঘর্ষ এবং বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের হেনস্তার অভিযোগ—সব মিলিয়ে একটি অস্থির চিত্র তৈরি হয়েছে। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো, যা একসময় নিরাপদ সেবা কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই উত্তেজনা ও সহিংসতার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। একদিকে হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ, অপরদিকে চিকিৎসক ও জনবলের ঘাটতি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকছে, কিন্তু সেই অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স বা অবকাঠামো নেই। ফলে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকরাও প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থাকছেন, আর রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।

এই অসন্তোষ অনেক সময় সহিংস রূপ নিচ্ছে। চিকিৎসা নিতে এসে রোগীর স্বজনরা যখন দীর্ঘ অপেক্ষা, সীমিত সেবা বা অপ্রত্যাশিত ফলাফলের মুখোমুখি হন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হচ্ছেন। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়া কোনো সমস্যার সমাধান নয়; বরং এটি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

অন্যদিকে চিকিৎসক সংগঠনগুলোর দাবি, এসব হামলার পেছনে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, সিন্ডিকেট এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কাজ করছে। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু গোষ্ঠী হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, টেন্ডার ও বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে চিকিৎসকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করছে। যদিও এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন, তবে পরিস্থিতির জটিলতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রোগী-চিকিৎসক আস্থার ভাঙন। চিকিৎসা একটি আস্থাভিত্তিক সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু যখন সেই আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন চিকিৎসা প্রক্রিয়া নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে তারা অনেক সময় ঝুঁকি এড়াতে রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার করেন, এতে রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হয় এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।

এদিকে সরকার চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনসার সদস্য মোতায়েন, বড় হাসপাতালগুলোতে ‘কোড ব্লু’ বা জরুরি অ্যালার্ম ব্যবস্থা চালু, এবং কিছু স্থানে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—শুধু নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে কি এই আস্থার সংকট সমাধান সম্ভব?

কারণ সমস্যার শিকড় শুধু নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি ব্যবস্থাপনা, সেবা সক্ষমতা, যোগাযোগ ঘাটতি এবং সামাজিক মনস্তত্ত্ব—সবকিছুর সমন্বিত ফল। চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে যদি সঠিক যোগাযোগ না থাকে, যদি রোগীর পরিবার পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না পায়, তবে ভুল বোঝাবুঝি থেকেই উত্তেজনা তৈরি হয়।

চিকিৎসকদের সংগঠনগুলো বলছে, বর্তমানে একটি ‘মব কালচার’-এর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যেখানে ছোট ঘটনাও দ্রুত বড় সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চিকিৎসকরা ঝুঁকি এড়াতে আরও সতর্ক বা রক্ষণশীল হয়ে পড়বেন, যা শেষ পর্যন্ত রোগীরই ক্ষতি করবে।

একই সঙ্গে চিকিৎসকদের ওপর হামলার বিচারহীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেক ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিচার ও জবাবদিহির এই দুর্বলতা পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

সব মিলিয়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন এক বহুমাত্রিক সংকটে রয়েছে। এটি শুধু চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং একটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। রোগী, চিকিৎসক, প্রশাসন ও সমাজ—সব পক্ষের মধ্যে আস্থা ও সমন্বয় ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিরাপদ না থাকে, তবে তার প্রভাব শুধু হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ থাকে না—তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এই আস্থার ভাঙন রোধ করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে একটি নিরাপদ, মানবিক ও কার্যকর কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনা।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ