নিরাপদ ঈদযাত্রার জন্য ইসলামি দোয়া

আর মাত্র কয়েকদিন পরেই মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ। নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে লাখো মানুষ। বাস, ট্রেন, লঞ্চ কিংবা ব্যক্তিগত যানবাহনে চড়ে সবাই ছুটছেন প্রিয়জনদের কাছে। তবে প্রতি বছরই ঈদের এই আনন্দযাত্রায় এক বড় আতঙ্কের নাম সড়ক দুর্ঘটনা। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, নিরাপদ ভ্রমণের জন্য চালক ও যাত্রী উভয়েরই যেমন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন ও ট্রাফিক আইন মেনে চলা কর্তব্য; তেমনি মুমিনের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাঁর শেখানো দোয়ার মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো সফরে বের হতেন, নিজের ও সফরসঙ্গীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ কিছু দোয়া পাঠ করতেন। নিচে সড়ক দুর্ঘটনা ও যেকোনো আকস্মিক বিপদ থেকে হেফাজতে থাকার জরুরি দোয়াগুলো তুলে ধরা হলো:
১. যানবাহনে আরোহণের পর পড়ার দোয়া
যানবাহনে (তা সে বাস, ট্রেন, গাড়ি বা মোটরসাইকেল যাই হোক না কেন) বসার পর বা যাত্রা শুরুর প্রাক্কালে এই দোয়াটি পড়া সুন্নাত। পবিত্র কুরআনের সূরা জুখরুফের ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতকে মহানবী (সা.) ভ্রমণের দোয়া হিসেবে পাঠ করতেন—
উচ্চারণ: ‘সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাজা ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনিন, ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনকালিবুন।’
অর্থ: ‘পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এসবকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, অন্যথায় আমরা একে বশে আনতে পারতাম না। আর আমরা অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’ (সূরা জুখরুফ: ১৩-১৪)
২. দুর্ঘটনার গ্রাস ও অকল্যাণ থেকে মুক্তির বিশেষ দোয়া
সফরের সময় যেকোনো ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা, জানমালের ক্ষতি এবং পথিমধ্যে যেকোনো বিপর্যয় থেকে বাঁচতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি দীর্ঘ দোয়া পড়তেন। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এই দোয়াটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিন ওয়াছাতীস সাফারি, ওয়া কাআবাতিল মানজারি, ওয়া সূইল মুনকালাবি ফিল মালি ওয়াল আহলি।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই সফরের ক্লান্তি ও কষ্ট থেকে, কোনো ভয়ানক বা হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা থেকে এবং পরিবার ও সম্পদের খারাপ পরিবর্তন (দুর্ঘটনা বা ক্ষতি) থেকে।’ (সহিহ মুসলিম)
৩. ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পড়ার দোয়া
বাড়ি থেকে স্টেশনের উদ্দেশ্যে বা সফরের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময়ই যদি আল্লাহর নাম নিয়ে বের হওয়া যায়, তবে পুরো সফরে ফেরেশতারা ওই ব্যক্তির নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন বলে হাদিসে এসেছে—
উচ্চারণ: ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।’
অর্থ: ‘আল্লাহর নামে (বের হচ্ছি), আল্লাহর ওপরই ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো পাপ থেকে বাঁচার এবং কোনো নেক কাজ করার শক্তি কারও নেই।’ (সুনানে আবু দাউদ)
৪. আকস্মিক বিপদ-আপদ থেকে সুরক্ষার দোয়া
পথিমধ্যে যেকোনো ধরণের হঠাৎ আসা বিপদ, দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নিরাপদে থাকতে সকাল-সন্ধ্যায় এবং সফরের মাঝে এই দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করা উচিত—
উচ্চারণ: ‘বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়া লা ফিস সামায়ি, ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম।’
অর্থ: ‘আল্লাহর নামে, যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।’ (সুনানে তিরমিজি)
ইসলামি স্কলারদের জরুরি পরামর্শ: শুধু দোয়াই নয়, প্রয়োজন সতর্কতা
জাতীয় মসজিদের খতিব ও বিশিষ্ট আলেমদের মতে, ইসলামে ‘তাকদির’ বা ভাগ্যের ওপর ভরসা করার পাশাপাশি নিজের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমে উট বাঁধার এবং তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করার কথা বলেছেন।
তাই সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে গাড়ি চালকদের অতিরিক্ত গতি (Over speeding) পরিহার করতে হবে, ক্লান্ত বা ঘুমন্ত চোখে গাড়ি চালানো যাবে না এবং ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতায় নামা গুনাহের শামিল। যাত্রীদেরও উচিত তাড়াহুড়ো না করে এবং চলন্ত গাড়িতে চালককে বিরক্ত না করে আল্লাহর জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে সফর জারি রাখা। তবেই আমাদের ঈদের আনন্দযাত্রা সত্যিকার অর্থে নিরাপদ ও বরকতময় হয়ে উঠবে।
দৈএনকে/জে, আ