মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ ঢেউ: একটি সমাজিক বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা

শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ ঢেউ: একটি সমাজিক বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা
ছবি: এআই
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে নৃশংস ও হৃদয়বিদারক অপরাধ হিসেবে দেশজুড়ে গভীর ক্ষোভ, শোক ও প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। এই একটি ঘটনাই শুধু নয়, এটি দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং দেশ-বিদেশে ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও একের পর এক ভয়াবহ অভিযোগ সামনে আসছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় শিশু নির্যাতনের ঘটনার পর খুলশী, বায়েজিদ ও ডবলমুরিং এলাকায় আরও দুটি ধর্ষণ ও একটি ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ সামনে এসেছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, খুলশী আবহাওয়া অফিসসংলগ্ন রেললাইনের পাশের একটি মসজিদসংলগ্ন মক্তবে দুই বোনের (প্রায় ১০ ও ৬ বছর বয়সী) সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকই তাদের পড়াতেন এবং এলাকাতেই বসবাস করতেন। ভুক্তভোগী শিশুর খালার ভাষ্যমতে, সকালে শিশুদের মক্তবে ডেকে নেওয়া হয় এবং দীর্ঘ সময় পরও তারা বাড়ি না ফেরায় খোঁজ নিতে গিয়ে তাদের একটি কক্ষের ভেতরে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে শিশুর আচরণ ও বক্তব্যে ‘খারাপ স্পর্শের’ বিষয়টি উঠে আসে বলে পরিবার জানায়। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছে।

একই সময়ে বায়েজিদ থানার মোহাম্মদ নগর এলাকায় পাঁচ বছরের এক শিশুকন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটিকে প্রলোভন দেখিয়ে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে বলে জানায় তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে ডবলমুরিং থানার হাজীপাড়া এলাকায় সাত বছরের এক শিশুর ক্ষেত্রে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয়দের হাতে অভিযুক্ত আটক ও গণপিটুনির শিকার হন, যা পরবর্তীতে পুলিশের হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রণে আসে।

এর আগে বাকলিয়া এলাকায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনায় পুরো এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ আহত হন।

এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—বরং একটি গভীর সামাজিক সংকেত। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা যেভাবে একের পর এক সামনে আসছে, তা গোটা সমাজকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, অপরাধের অনেক ঘটনাই ঘটছে পরিচিত পরিবেশে, যেখানে শিশুদের সবচেয়ে বেশি নিরাপদ থাকার কথা।

মিরপুরের রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর যে বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রতিবাদ শুরু হয়েছে, তা প্রমাণ করে—শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনমত এখন আর নীরব নয়। কিন্তু সেই জনমতের প্রতিফলন যদি বাস্তব পরিবর্তনে রূপ না নেয়, তবে প্রতিটি প্রতিবাদই কেবল সাময়িক ক্ষোভে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

শিশুদের নিরাপত্তা এখন আর কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়—এটি একটি সমাজের নৈতিক কাঠামোর পরীক্ষা। পরিবার, প্রতিবেশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সচেতনতা—সব মিলিয়েই এই ব্যর্থতার দায় বহন করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কেবল দোষারোপ নয়, বরং সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ ও স্থায়ী সচেতনতা।

আজ প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সত্যিই একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে প্রস্তুত, নাকি প্রতিটি নতুন ঘটনার পর কেবল শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করছি?


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ