হাস্যরসের আড়ালে ট্রেন্ড অনুসরণের বিপদ

ডিজিটাল বিশ্বে আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী স্মার্টফোন। স্ক্রল করতে করতে আমরা হাসছি, মিম (Meme) শেয়ার করছি, হাহা রিঅ্যাক্ট দিচ্ছি। কিন্তু এই আপাতমজাদার ছবি বা ভিডিওগুলো কি কেবলই কৌতুক? নাকি এগুলো ইতিহাসের সবচেয়ে উন্নত ও ভয়ংকর ‘মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র’? বর্তমান সময়ের তথ্যপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার এখন আর গম্ভীর বক্তৃতায় আসে না; বরং তা আসছে অত্যন্ত চতুর মিম হয়ে, যা মানুষের মগজ ধোলাইয়ের এক নতুন হাতিয়ার।
তথ্যের ছদ্মবেশে মূর্খতার বিস্তার
ধর্মীয় ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়, শেষ জমানায় জ্ঞান উঠে যাবে এবং মূর্খতা ছড়িয়ে পড়বে। আজকের যুগে আমরা ভাবি আমরা অনেক স্মার্ট, কারণ আমরা মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে ‘এজেন্ডা’ মনে করে এড়িয়ে চলি। কিন্তু এই সুযোগেই আমাদের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে মিম কালচার। যখন কোনো সিরিয়াস বিষয়কে মিম বানিয়ে উপস্থাপন করা হয়, তখন আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিরোোধ গড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কারণ মানুষ যা দেখে হাসে, সেটিকে সে শত্রু মনে করতে পারে না। এটাই হলো ডিজিটাল ট্র্যাপ বা ফাঁদ।
‘ডিসেনসিটাইজেশন’ বা অনুভূতিহীনতার মরণখেলা
মিম কালচারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো ‘ডিসেনসিটাইজেশন’। কোনো ভয়াবহ অপরাধ বা সামাজিক বিপর্যয় যখন মিম হয়ে আমাদের সামনে আসে, তখন আমরা শিউরে ওঠার বদলে হেসে ফেলি। উদাহরণস্বরূপ—বিখ্যাত ‘এপস্টাইন ফাইল’ ফাঁসের মতো জঘন্য ঘটনাগুলো যখন ইন্টারনেটে মজার ভিডিও হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন অপরাধটি স্রেফ ‘কন্টেন্ট’ হয়ে যায়। ফলে মানুষের ভেতরে থাকা প্রতিবাদের আগুন নিভে গিয়ে কেবল উপহাস অবশিষ্ট থাকে। পবিত্র কুরআনের সূরা আন-আম (আয়াত ৬৮)-এ এ ধরণের উপহাসমূলক পরিবেশ থেকে সরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ এগুলি সুস্থ চিন্তার ‘দূষণ’।
অ্যালগরিদম ও প্রবৃত্তির লড়াই
অনেকেই মনে করেন মিম আপনা-আপনি ভাইরাল হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম সত্যকে নয়, বরং ‘এনগেজমেন্ট’ বা সম্পৃক্ততাকে পুরস্কৃত করে। মানুষের রাগ, ভয়, লালসা এবং উপহাসই সবচেয়ে বেশি এনগেজমেন্ট তৈরি করে। ইসলাম যে আবেগগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছে, সেই প্রবৃত্তিগুলোকেই আজ ব্যবহারকারী বনাম ব্যবহারকারী লড়াইয়ে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে নারী-পুরুষের চিরন্তন শ্রদ্ধার সম্পর্ক আজ মিমের কল্যাণে ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
রোমান ফর্মুলা: রুটি ও সার্কাস
২,০০০ বছর আগে রোমানরা একটি ফর্মুলা দিয়েছিল— "Bread and Circuses"। অর্থাৎ মানুষকে পেটভরা খাবার আর বিনোদনে ডুবিয়ে রাখলে তারা আর শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করবে না। আজকের যুগে সেই বিনোদনের আধুনিক রূপ হলো ফোনের ‘ডোপামিন’ আর ‘ফর ইউ পেজ’। মানুষ এখন স্বেচ্ছায় মিথ্যুকে সত্য বলছে এবং মন্দকে বিনোদন ভাবছে। এই ‘ট্রেন্ড’ অনুসরণ করতে করতে মানুষের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি লোপ পাচ্ছে, যা দাজ্জালের ফিতনার এক শক্তিশালী মহড়া হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সময় ফুরিয়ে আসার আগেই আমাদের জেগে ওঠা জরুরি। প্রতিটি মিম শেয়ার করার আগে ভাবুন—আপনি কার হয়ে কাজ করছেন? যখন কোনো গুরুতর জাতীয় বা ধর্মীয় ইস্যু স্রেফ কৌতুক হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে লাভটা আপনার হচ্ছে না, বরং পর্দার আড়ালে থাকা কোনো বিশেষ শক্তির হচ্ছে। ইসলাম চোখ বুজে থাকার ধর্ম নয়; সচেতনভাবে ট্রেন্ডের জোয়ার থেকে নিজের বিবেককে রক্ষা করাই এখনকার সবচেয়ে বড় জিহাদ।
দৈএনকে/জে, আ