শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু স্টয়নিসের ঝড়ে এক ওভারে ৫ ছক্কা, দুঃস্বপ্নের ম্যাচ ইয়ান হল্যান্ডের গুমের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে, ছাড় নয়: মির্জা ফখরুল চীন সফর শেষে আজ রাতে ঢাকায় ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী, শোডাউন না করতে নির্দেশ তারেক-শি বৈঠকে নতুন গতি, বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে ১৭ সমঝোতা সই ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে নিহতদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শোক ও সমবেদনা স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’, জনবান্ধব সেবায় জোর সরকারের মাদক প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাজেটে করের বোঝা সাধারণের ওপর, ধনীদের সুবিধা বহাল: সিপিডি বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছা বিনিময় প্রধানমন্ত্রীর
  • কামরুলের থাবায় ৪৩৫ কোটি টাকার রাজস্ব উধাও

    কামরুলের থাবায় ৪৩৫ কোটি টাকার রাজস্ব উধাও
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়া, লাইসেন্স নবায়নে উৎকোচ গ্রহণ, নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে কর ফাঁকির সুবিধা দিয়ে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জন করার অভিযোগ উঠেছে এনবিআরের এক যুগ্ম কমিশনারের বিরুদ্ধে।

    তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ বন্ডের যুগ্ম কমিশনার কামরুল ইসলাম এবং ডিসি পূরবী সাহার নিয়ন্ত্রণাধীন রাফায়েত ফেব্রিক্স এবং এস ইসলাম হোম এন্ড ফ্যাশন লিমিটেড মাত্র ১ বছরেই ৪৩৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। কামরুল ইসলাম দক্ষিণ বন্ডে পদায়নের পর মাত্র ১ বছরে এই প্রতিষ্ঠানদ্বয়কে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছেন। ভুয়া নিরীক্ষা এবং তথ্য যাচাই না করে সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানসমূহের বন্ডেড প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করেছেন। তাই সামনের বছরে দুই প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ হবে ৮০০ কোটি টাকা।

    অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, গত মাসে এই রাফায়েত ফেব্রিক্স প্রতিষ্ঠানে প্রিভেন্টিভের নাম করে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নজরদারী তুলে দিতে জোর করে পত্র জারী করেন। এর ফলে চট্টগ্রাম কাস্টমস এই প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানিতে নজরদারী করতে পারবে না। কথিত আছে, কামরুল ইসলাম এই কাজে এই প্রতিষ্ঠান হতে ৩০ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ করে। আর এই ঘুষের লেনদেন সম্পন্ন হয় সুদূরে জাপানে। কামরুল ইসলাম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন সদস্যের আশীর্বাদে গত ৬ মাসে তিন বার জাপান সফর করেন। জাপানে তার গাড়ীর ব্যবসা ছাড়াও আবাসনে বিনিয়োগ রয়েছে।

    জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিআইসি সেলকে ম্যানেজ করার জন্য এই প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছ থেকে ঘুষ নেন ১ কোটি টাকা। এই ঘুষ সরাসরি ফালতুর মাধ্যমে উত্তরায় গ্রহণ করেন। পরবর্তী আরও ৩০ লাখ টাকা গ্রহণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন প্রভাবশালী সদস্যকে দেয়া হয়। শুল্ক গোয়েন্দায় ডিজি থাকাকালীন এই সদস্য রাজীব এন্টারপ্রাইজ সিএন্ডএফ এজেন্টের সাথে মিলিতভাবে প্রতি ৫ লাখ টাকা রফা দফা করে বন্ডের মাল পাচারে সিন্ডিকেট তৈরী করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানাধীন মফস্বল গ্রাম নোয়ানগরের মৃত মোহাম্মদ আলীর সন্তান এই কামরুল ইসলাম।

    ফ্যাসিস্ট আমলে আলোচিত জনপ্রশাসনের ১২টি গেজেটের মাধ্যমে ৩০তম বিসিএসে কাস্টমস ক্যাডারে নিয়োগের চূড়ান্ত গেজেট হয় ১৭-০৫-২০১২ সালে। 

    অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঐ বিসিএসে প্রশ্ন ফাঁসের কারিগর ড্রাইভার আবেদ আলীর থেকে প্রশ্ন কিনে লিখিত পাস করেন কামরুল। এরপর পতিত আওয়ামীলীগের তৎকালীন জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের সুপারিশে ভাইভা বৈতরণী পার হন তিনি। যার কন্ট্রাক্ট ছিলো ৩৫ লাখ টাকা। গেজেট অনুযায়ী ০৩-০৬-২০১২ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সহকারী কমিশনার (শুল্ক ও আবগারী) হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পরপরই তার প্রথম পদায়ন হয় কাস্টমস হাউজ, চট্টগ্রামে। 

    তারপর ২৯ আগস্ট ২০১৩ সালে পদায়ন হয় কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, যশোরে। যশোর কমিশনারেটের অধীন ফরিদপুর ও কুষ্টিয়া ডিভিশনে তিনি চাকুরি করেন ২০১৫ সাল পর্যন্ত। কিন্তু ফরিদপুরে যোগদান করে তিনি সখ্যতা গড়ে তোলেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিয়াই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে। মোশাররফের আর্শিবাদ পেয়ে শুরু হয় তার দুর্নীতিতে পথচলা। ফরিদপুরের বিভিন্ন ইটভাটা, মিস্টান্ন শো রুম, আবাসিক হোটেল-রেস্তোরায় চালায় বার বার অভিযান। তাতে তাকে পেয়ে বসে টাকার নেশা। যেসব প্রতিষ্ঠান তাকে চাহিদা অনুযায়ী টাকা প্রদান করতো না তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দিতো। ভুক্তভোগীরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে চাইলে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের ডান হাত ফরিদপুরের ত্রাস দুই সহোদর বরকত ও রুবেলকে দিয়ে দিতো প্রাণনাশের হুমকি। তাতেও থামছিলো না কামরুলের টাকার নেশা।

    ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের সাথে সখ্যতা কাজে লাগিয়ে মাত্র ৭ মাসের মাথায় কামরুল ভাগিয়ে নেন যশোর কাস্টমস কমিশনারেটের লোভনীয় পোস্টিং কুষ্টিয়া ডিভিশনে। ৩ এপ্রিল অর্ডার হলে কুষ্টিয়ায় যোগদান করেন ১৩ এপ্রিল ২০১৪তে। সেই সাথে অতিরিক্ত দায়িত্ব পান মেহেরপুর ডিভিশনেরও। এখানে এসেই যেন কামরুল পেয়ে যান আলাদীনের চেরাগ। দুর্নীতির টাকায় ২ কোটি টাকা খরচ করে আইন ও বিধি বহির্ভূত তিনি নিজের অফিসকে রাজকীয় সাজসজ্জায় পরিণত করেন। 

    যেখানে টাকার উৎস ছিলো নকল সিগারেট ও বিড়ির ব্যান্ড রোল ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান আনন্দ বিড়ি, জনি বিড়ি, মণিপুরীসহ ভেড়ামারা ও দৌলতপুর উপজেলার শতাধিক প্রতিষ্ঠান। সেই সাথে তিনি নিজের পকেটে ঢুকায় ৫০ কোটি টাকা। এখান থেকেই শুরু হয় কামরুল ইসলামের দুর্নীতির উত্থান। তৎকালীন এই জালিয়াতির কারণে দুদক কয়েকবার তার অফিসে অভিযান চালায়। কিন্তু চতুর কামরুল ইসলাম মোটা অংকের টাকা দিয়ে তা ম্যানেজ করে ফেলেন।

    এরপরও চলতে থাকে নানান অজুহাতে বিভিন্ন সিগারেট-বিড়ি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রিভেন্টিভের ভয় দেখিয়ে আরো বেশি করে অর্থ আদায়। একপযায়ে কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফুসে উঠে বৈধভাবে করা ব্যবসায়ী। করে মানববন্ধন। প্রদান করা হয় জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারক লিপি। ৩০ জুলাই ২০১৭ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে বদলি হন কাস্টমস এক্সসাইজ ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা দক্ষিণে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আনার নিয়ম থাকলেও কামরুল ইসলামের যোগসাজশে তা সরাসরি চলে যাচ্ছে রাজধানীর ইসলামপুর ও নয়াবাজারের পাইকারি মার্কেটে। এর ফলে সরকার প্রতি মাসে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। বেশ কিছু অখ্যাত ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের ফাইল ক্লিয়ারেন্সের বিনিময়ে তিনি বড় অংকের কমিশন নেন বলে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েক জন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। 

    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী দৈনিক মুক্ত খবরের এই প্রতিবেদককে বলেন, বন্ড লাইসেন্স নবায়ন কিংবা অডিট রিপোর্ট জমা দিতে গেলেই যুগ্ম কমিশনারের সঙ্গে বিশেষ সখ্যতা থাকা উপ-কমিশনার পূরবী সাহার মাধ্যমে বড় অংকের টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তুচ্ছ অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয় কয়েক মাস। সরেজমিন তদন্তে জানা গেছে, গত দুই বছরে কামরুল ইসলামের নির্দেশে বেশ কিছু বৈধ প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে শুধুমাত্র অনৈতিক সুবিধা না পাওয়ার কারণে।

    খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কামরুল ইসলামের আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ। ঢাকার অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ছাড়াও তাঁর নিজ গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার বড় চাপা গ্রামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার ভূ-সম্পত্তি। বানিয়েছেন বিশাল আকৃতির বাগান বাড়ি। গ্রামের মতো জায়গায় কামরুল ইসলাম দুর্নীতির টাকায় বানিয়েছেন আধুনিক সুইমিং পুল। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে হুণ্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে।

    ২০২৪ এর ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর পরই কামরুল ইসলাম চলে যান সিঙ্গাপুরে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তিনি সিঙ্গাপুরে পাচার করেছেন শতকোটির উপরে টাকা। বন্ড সেক্টরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই দুর্নীতি দেশের রপ্তানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং রাজস্ব ফাঁকি রোধে কঠোর তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে যুগ্ম কমিশনার মোঃ কামরুল ইসলামের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

    যুগ্ম কমিশনার কামরুল ইসলাম বিগত দিনে আওয়ামী মন্ত্রী এমপিদের সাথে লেয়াজো করে দপ্তরে মাফিয়া সিন্ডিকেট বানিজ্য পরিচালনা করে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। একজন আওয়ামী মদদপুষ্ঠ কর্মকর্তাকে দিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে কার্যক্রম পরিচালিত হলে সরকারের দেশের উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাধা পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। তাই বর্তমান বিএনপি সরকার এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয় তা এখন দেখার বিষয়।

    চলবে.............


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন