জ্বালানি, সমুদ্রবিজ্ঞান ও হরমুজ প্রণালি

মানচিত্রে মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া একটি সরু নীল রেখা। কিন্তু এই ক্ষুদ্র জলপথটির ওপরই নির্ভর করে টিকে আছে গোটা বিশ্বের জ্বালানি অর্থনীতি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত ‘হরমুজ প্রণালি’ বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ইরানি আক্রমণের পর পাল্টাপাল্টি হামলায় এই প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে তেহরান, যা বিশ্ববাজারে তেলের দামে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অয়েল চোক পয়েন্ট’
প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট পেট্রোলিয়ামের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই পথ পেরিয়ে এশিয়াসহ ইউরোপের দেশগুলোতে পৌঁছায়। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির চার-পঞ্চমাংশই যায় চীন, ভারত ও জাপানের মতো এশীয় দেশগুলোতে। ফলে এই পথে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত গঠন
ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ এবং ইরানের বন্দর আব্বাসের মাঝখানে অবস্থিত এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য মাত্র ৩ কিলোমিটার চওড়া দুটি নির্দিষ্ট লেন রয়েছে। এর গভীরতা ৬০ থেকে ১০০ মিটার, যা বিশাল আকৃতির সুপারট্যাঙ্কার চলাচলের জন্য উপযোগী। ওমানের জলসীমায় পড়লেও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের আওতায় এটি একটি বৈশ্বিক নৌপথ হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্যাঙ্কারের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিমার প্রস্তাব দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সমুদ্রবিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর ক্ষেত্র
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু তেলের ট্যাঙ্কারেই সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, এখানে ‘ইনভার্স-এস্টুয়ারি সার্কুলেশন’ বা উল্টো মোহনা প্রবাহ নামক এক জটিল প্রক্রিয়া কার্যকর। পারস্য উপসাগরের অতিরিক্ত বাষ্পীভবনের ফলে পানি লবণাক্ত ও ভারী হয়ে নিচের স্তর দিয়ে সাগরে বেরিয়ে যায়, আর ওপরের স্তর দিয়ে ভারত মহাসাগরের অপেক্ষাকৃত কম লবণাক্ত পানি ভেতরে প্রবেশ করে। এই দুই স্তরের প্রবাহ উপসাগরের লবণের ভারসাম্য বজায় রাখে।
জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি
এই প্রণালি দুই অঞ্চলের সামুদ্রিক প্রাণের এক মিলনস্থল। সূর্যের আলো ও পুষ্টির সঠিক ভারসাম্যে এখানে প্রায়ই ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের বিশাল ‘ব্লুম’ বা সবুজ বিস্ফোরণ দেখা যায়, যা মহাকাশ থেকেও দৃশ্যমান। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রে লবণাক্ত বর্জ্য ফেলার ফলে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। বিষাক্ত শৈবাল বা ডাইনোফ্ল্যাজেলেটের বিস্তার ঘটলে তা সামুদ্রিক প্রাণী ও মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ স্রোত—এই তিনের এক জটিল সমীকরণ হলো হরমুজ প্রণালি। এই পথে ট্যাঙ্কার চলাচল নির্বিঘ্ন থাকলেই কেবল বিশ্ব তেলের বাজার স্থিতিশীল থাকা সম্ভব, অন্যথায় এর প্রভাব পড়বে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে।
দৈএনকে/জে, আ