দুর্বল গোয়েন্দা ব্যবস্থা মানেই অস্থির রাষ্ট্রব্যবস্থা

রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার দৃশ্যমান ক্ষমতায় নয়, বরং অদৃশ্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় নিহিত। সেই অদৃশ্য শক্তির অন্যতম স্তম্ভ হলো গোয়েন্দা কাঠামো। সরকার পরিবর্তিত হয়, নীতি বদলায়, রাজনৈতিক সমীকরণ ঘুরে দাঁড়ায়—কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার দায় বহন করে যে প্রতিষ্ঠানগুলো, তাদের মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থা অন্যতম। এই কাঠামো দুর্বল হলে রাষ্ট্রও ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে পড়ে।
গোয়েন্দা সংস্থার কাজ কেবল ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন নয়; বরং সম্ভাব্য সংকটের পূর্বাভাস দেওয়া, ভেতরের ও বাইরের ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং নীতিনির্ধারকদের সঠিক সময়ে সতর্ক করা। একটি কার্যকর গোয়েন্দা ব্যবস্থা সরকারের জন্য চোখ ও কান হিসেবে কাজ করে। এই চোখ-কান যদি অকার্যকর হয়, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল বাড়ে, বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পেশাদারিত্ব হারিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের বলয়ে আবদ্ধ হয়। নিরপেক্ষ তথ্য বিশ্লেষণের বদলে যদি দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পায়, তবে প্রকৃত হুমকি আড়ালেই থেকে যায়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে—সঠিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা কিংবা ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করা সরকারের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। অস্থিরতা হঠাৎ তৈরি হয় না; তা ধীরে ধীরে জমে ওঠে, আর গোয়েন্দা ব্যর্থতা সেই জমাট সংকটকে বিস্ফোরণে রূপ দেয়।
বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় নিরাপত্তা হুমকির ধরন বদলে গেছে। সাইবার আক্রমণ, ভুয়া তথ্যের বিস্তার, আর্থিক নাশকতা, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ—সবকিছুই এখন বহুমাত্রিক। এসব মোকাবিলায় প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, দক্ষ বিশ্লেষণী সক্ষমতা এবং আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয়। পুরোনো পদ্ধতি বা কাগুজে কাঠামো দিয়ে আধুনিক সংকট প্রতিরোধ সম্ভব নয়।
তবে শক্তিশালী গোয়েন্দা ব্যবস্থার অর্থ অবারিত ক্ষমতা নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। জবাবদিহিহীন নজরদারি যেমন বিপজ্জনক, তেমনি নজরদারির দুর্বলতাও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রয়োজন আইনের শাসনের ভেতরে থেকে দক্ষ ও নিরপেক্ষ গোয়েন্দা কাঠামো গড়ে তোলা।
আজ সময় এসেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নতুনভাবে ভাবার। আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ উন্নয়ন এবং তথ্য বিশ্লেষণে দক্ষতা বাড়ানো—এসব আর বিলাসিতা নয়, অপরিহার্যতা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গোয়েন্দা তথ্য সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
রাষ্ট্রের স্থিতি জনগণের আস্থায় টিকে থাকে, কিন্তু সেই আস্থা সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা কাঠামো। দুর্বল গোয়েন্দা ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে অন্ধ করে দেয়—আর অন্ধ রাষ্ট্রের পক্ষে স্থিতিশীল থাকা কঠিন। অতএব, স্থিতিশীল ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে হলে গোয়েন্দা কাঠামোকে শক্তিশালী, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক করে তোলাই এখন সময়ের দাবি।