কম আয়ের মানুষের নাগালের খেজুর কেন অগ্নিমূল্যে?

রমজান মানেই খেজুরের চাহিদা বাড়া। কিন্তু এবারের চিত্রে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য স্পষ্ট—আমদানি বেড়েছে, বাজারে সরবরাহও স্বাভাবিক; তবু ‘কম দামি’ জাহেদি খেজুরের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবলই দুর্ঘটনাজনিত সাময়িক প্রভাব, নাকি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ফল?
চট্টগ্রামের ফলমন্ডি রেলওয়ে মেনস মার্কেট—দেশের অন্যতম বৃহৎ খেজুরের পাইকারি কেন্দ্র—এখন খেজুরে সয়লাব। ৫০টির বেশি জাতের খেজুর মিলছে এখানে। আজোয়া, মাবরুম, মেদজুল, মরিয়ম, সাফাবি, সুক্কারি—সবই রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, এসব অধিকাংশ খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় কম।
কিন্তু ব্যতিক্রম জাহেদি। যে খেজুর নিম্ন ও নিম্নমধ্য আয়ের মানুষের প্রধান ভরসা, সেই জাহেদির ১০ কেজির প্যাকেট ১৫ দিনের ব্যবধানে ১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬০০ টাকায় উঠেছে। কেজিপ্রতি দামও ১৪৫ টাকা থেকে ২০০ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ, সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে সেই শ্রেণির ওপর, যাদের ক্রয়ক্ষমতা সবচেয়ে সীমিত।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, থাইল্যান্ডের কাছে আন্দামান সাগর–এ ডুবে যাওয়া জাহাজে বিপুল পরিমাণ জাহেদি খেজুর ছিল। মালয়েশিয়া থেকে চট্টগ্রামগামী ওই জাহাজ ফুকেট উপকূলে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ফলে রমজানের আগে নির্ধারিত সময়ের চালান বাজারে আসেনি।
কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন—যখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় খেজুর আমদানি ৭ হাজার টনের বেশি বেড়েছে, তখন একটি দুর্ঘটনার প্রভাব এত দ্রুত ও তীব্রভাবে কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতের ওপর পড়ল কীভাবে? বাজারে অন্য সব খেজুরের দাম কমলেও জাহেদির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেন?
রমজানের মতো ধর্মীয় সংবেদনশীল সময়ে বাজারের সামান্য অস্থিরতাও বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য জাহেদি খেজুরই প্রধান পছন্দ। তাদের জন্য মূল্যবৃদ্ধি মানে সরাসরি ভোগান্তি।
এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ, আমদানির সঠিক পরিসংখ্যান যাচাই এবং বাজার তদারকি জোরদার করা। যদি সরবরাহ সত্যিই পর্যাপ্ত থাকে, তবে মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা জরুরি। আর যদি দুর্ঘটনাজনিত ঘাটতি বাস্তব হয়, তবে দ্রুত বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত।
রমজানের প্রাক্কালে বাজারে অস্থিরতা যেন কারও জন্য বাড়তি মুনাফার সুযোগ না হয়—এ দায়িত্ব প্রশাসন, ব্যবসায়ী এবং নীতিনির্ধারক সবার। কারণ, খেজুর এখানে শুধু একটি পণ্য নয়; এটি ধর্মীয় আচার, সামাজিক সংহতি এবং সাধারণ মানুষের নাগালের প্রতীক।