শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
বিনম্র শ্রদ্ধায় অমর একুশে

ভাষার অধিকারে বাঙালির অগ্নিস্নান

ভাষার অধিকারে বাঙালির অগ্নিস্নান
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আজ ২১ ফেব্রুয়ারি—রক্তস্নাত এক ঐতিহাসিক দিন। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বাঙালি জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে সেই বীর সন্তানদের, যারা ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। পলাশ-শিমুলে রাঙা এ দিনটি আমাদের কাছে একই সঙ্গে শোকের ও গৌরবের।

বায়ান্নর উত্তাল দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নামা ছাত্রদের ওপর তৎকালীন পুলিশের গুলিবর্ষণে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অনেকে। তাঁদের আত্মত্যাগেই অর্জিত হয়েছে আমাদের ভাষার অধিকার। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”—এই কালজয়ী গান আজও জাতির হৃদয়ে অনুরণিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের সূচনা ১৯৪৭ সালের শেষভাগে হলেও ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে ঝরে যায় তরতাজা প্রাণ। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসে। মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠা অস্থায়ী শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও দমেনি আন্দোলন। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮৭ সালে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন বিল’ পাসের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাংলা ব্যবহারের আইনি ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়।

একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি পালন করা হচ্ছে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে ও কালো পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে জাতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে ভাষা শহীদদের।

একুশের চেতনা আজ আন্তর্জাতিক পরিসরেও স্বীকৃত। ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ দিবসটি পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করে। ফলে বিশ্বের নানা দেশে ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বহুভাষিক শিক্ষার গুরুত্ব নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে।

মাতৃভাষার জন্য প্রাণদানের এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তাই একুশ কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রেরণা। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলা ভাষার চর্চা, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারে আরও মনোযোগী হতে হবে। ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ, সঠিক ব্যবহার ও সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অমর একুশ আমাদের শিখিয়েছে—অধিকার আদায়ে সংগ্রাম অনিবার্য, আর সেই সংগ্রামের শক্তি আসে আত্মপরিচয়ের গভীর বোধ থেকে। ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ আমরা শপথ নিই—বাংলা ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখব, একই সঙ্গে বিশ্বের সব ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব।

একুশের রক্তিম প্রভাত আমাদের চেতনাকে জাগ্রত রাখুক চিরকাল।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ

আরও পড়ুন