ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নতুন সরকারের সামনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ

১৭ বছরের স্বেচ্ছানির্বাসন শেষে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তার এই প্রত্যাবর্তন নতুন প্রত্যাশা তৈরি করে। তবে পাঁচ দিনের মাথায় ৩০ ডিসেম্বর তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু জাতীয় রাজনীতিতে আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠনের পথে এগোয়।
সরকার গঠনের আগে নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি পুনরুদ্ধার। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে, কর্মসংস্থান কমে যায় এবং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও প্রত্যাশার তুলনায় কম। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা ছাড়া অর্থনীতিতে গতি ফেরানো কঠিন হবে।
মূল্যস্ফীতিও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানায়, ডিসেম্বর মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। প্রকৃত আয় না বাড়ায় সাধারণ মানুষ চাপে রয়েছেন। বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে।
রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)–র তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই–জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি।
রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্য কম আদায় করেছে। বড় বাজেট বাস্তবায়নে তহবিল ব্যবস্থাপনা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চহার আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। আর্থিক খাতে সুশাসন ও নজরদারি জোরদার না করলে সামগ্রিক অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে না।
এছাড়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান Power and Participation Research Centre (পিপিআরসি)–র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার বেড়ে প্রায় ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলা কঠিন হবে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে। শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাবনায় রপ্তানি খাতে প্রস্তুতি এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি জোরদার করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সুযোগ তৈরি করলেও বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর নীতিনির্ধারণের ওপর।