শনিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫
Natun Kagoj

অবৈধ এমডির দখলে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, নিশ্চুপ বাংলাদেশ ব্যাংক

অবৈধ এমডির দখলে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, নিশ্চুপ বাংলাদেশ ব্যাংক
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

গত ৩০শে অক্টোবর ২০২৫ তারিখে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে অনুষ্ঠিত বোর্ড মিটিঙে উপস্থিত ১১ জন পরিচালকের মধ্যে এমডি হাবিবুর রহমানের বিষয়ে তুমুল আলোচনা হয়| এস আলমের অনুকূলে ইউনিয়ন ব্যাংক হতে ২৬০৭ কোটি টাকার লুটপাট, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে প্রতারণা মামলায় চার্জশীট সহ উক্ত সভা চলাকালীন সময়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পুলিশের ব্যাপক আনাগোনার  বিষয়ে পর্ষদের অধিকাংশ সদস্য তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন| 

পরবর্তীতে ৬ জন পরিচালকের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে হাবিবুর রহমানকে ৯০ দিনের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয় এবং চেয়ারম্যান জনাব আব্দুল আজিজের স্থলে তারই পুত্র জনাব আব্দুল আলিমকে বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়|

এছাড়াও ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৬০৭ কোটি টাকার কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের DBI -৭ এর পরিদর্শন রিপোর্টে হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে বিরূপ পর্যবেক্ষণ থাকায় BRPD সার্কুলার-৫ অনুযায়ী তার এমডি পদে থাকার যোগ্যতা না থাকায়, তাকে এমডি পদ থেকে অপসারণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি চাওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়|

এই সকল সিদ্ধান্ত সম্বলিত বোর্ড রিসোলিউশন ৬ জন পরিচালকের স্বাক্ষরে অবিলম্বে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রেরণ করা হয় | কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে বোর্ড থেকে ৯০ দিনের ছুটি দেয়ার পর ও অবৈধ ভাবে ও গায়ের জোরে হাবিবুর রহমান এখনো প্রতিদিন অফিস করছেন ও এমডির কাগজ পত্রে সই করছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনোদিন ঘটেনি| এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থাকার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক কেন কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে, তা বোধগম্য নয়| এইরূপ অবৈধ ভাবে এমডির পদ আঁকড়ে থাকা হাবিবুর রহমানের নজিরবিহীন বেআইনি ক্ষমতা দখল ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রহস্যময় নিশ্চুপতার কারণে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এক গভীর সংকটে পড়েছে এবং তার লক্ষ লক্ষ আমানতকারীরা চরম আতঙ্কের ভেতরে রয়েছেন| 

এই অবস্থায় অবৈধ এমডির স্বাক্ষরিত সমস্ত বেআইনি আদেশ ও অনুমোদনের দায়-দায়িত্ব কি বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে কিনা এবিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে |

এরআগে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তিনি ইউনিয়ন ব্যাংকে কর্মরত থাকাকালে এস আলম গ্রুপের অনুকূলে ২৬০৭ কোটি টাকার অনিয়মিত ঋণ অনুমোদনে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এমন অভিযোগ উঠেছে যে, তার নেতৃত্বে একাধিক ভূয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে বিপুল অর্থ পাচার করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগ–৭ এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১-২২ সালে ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের নামে পরিচালিত প্রায় ৩০টি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে ২৩ কোটি থেকে ১৪৮ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়, যার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬০৭ কোটি টাকা। ঋণগুলো এখন সম্পূর্ণ খেলাপি, আর বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, তৎকালীন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিনিয়োগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে মো. হাবিবুর রহমান এসব ঋণ অনুমোদনে “সরাসরি ভূমিকা” রাখেন। ঋণ প্রস্তাবগুলোর অফিস নোটে তার স্বাক্ষর পাওয়া গেছে, যা “প্রধান কার্যালয়ের প্রথম ও শেষ অনুমোদন” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চার্জশীটও রয়েছে। ২০০০ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ক্রেডিট বিভাগে দায়িত্বে থাকাকালে তিনি “প্যাট্রিক ফ্যাশনস” নামের এক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ গোপন করে নতুন করে আট কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের জন্য মিথ্যা তথ্য দেন এমন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, যোগসাজশ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলা হয়। মামলাটি বর্তমানে মেট্রো স্পেশাল কোর্টে (মামলা নং ২৭২/২২) বিচারাধীন।

দুদকের মামলায় চার্জশীটভুক্ত আসামি হওয়ার পর ২০২৪ সালে হাইকোর্ট বাংলাদেশ ব্যাংক কে ৬০ দিনের মধ্যে তার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন (রিট নং ৫২১৭/২০২৪)। এর পরপরই হাবিবুর রহমান স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এমডি পদ থেকে পদত্যাগ করেন, যা বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদনও দেয়।

তবে বিস্ময়ের বিষয়, কিছুদিন পরই বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই তাকে আবারও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এমডি পদে অনুমোদন দেয়, যা ব্যাংক খাতে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ একই মামলায় চার্জশীটভুক্ত অন্য আসামি রবিউল ইসলামকে এনআরবিসি ব্যাংকের এমডি পদে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দেয়নি।

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ভেতরের একাধিক সূত্র জানায়, পুনঃনিয়োগের পর থেকেই হাবিবুর রহমান “অস্বাভাবিক ক্ষমতার প্রভাব” বিস্তার করেছেন। তিনি কয়েক মাসের মধ্যে শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বেআইনি ও অযৌক্তিকভাবে চাকরিচ্যুত করেছেন। অন্যদিকে, ইউনিয়ন ব্যাংকের সময়কার কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তাকে তিনি পুনরায় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে নিয়োগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হলো ব্যাংকের বর্তমান মানবসম্পদ প্রধান মনসুর আহমেদ এবং প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (CFO) মো. সালাহ উদ্দিন। দুজনই ইউনিয়ন ব্যাংকের বিনিয়োগ কমিটির সদস্য ছিলেন এবং ঐ ভূয়া ঋণ অনুমোদনে ভূমিকা রাখেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ আছে। তাদের তিনজনকেই (হাবিব, মনসুর, সালাহ উদ্দিন) সম্প্রতি দুদক তলব করেছে ইউনিয়ন ব্যাংকের অর্থ পাচার তদন্তে।

অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব হোসেন বলেন, একজন চার্জশীটভুক্ত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আবারও এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট তৈরি করে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ

আরও পড়ুন